বিশ্বরেকর্ড বাংলার মেয়ের, শ্বাসকষ্ট নিয়েও ১১ ঘন্টা বরফ শীতল উত্তাল সমুদ্রে সাঁতার কেটে কুক প্রণালী জয় সায়নীর

Sayani: বিশ্বে আবারও বাংলার জয়জয়কার। বরফ শীতল উত্তাল সমুদ্রে তুমুল বৃষ্টির মধ্যে প্রবল শ্বাসকষ্ট নিয়ে নিউজিল্যান্ডের কুক স্ট্রেট চ্যানেল জয় করলেন বাংলার মেয়ে সায়নী দাস। সপ্তসিন্ধু জয়ের পথে আরও একধাপ এগিয়ে গেলেন বর্ধমানের জলকন্যা। রটনেস্ট, ক্যাটালিনা, ইংলিশ চ্যানেল, মালোকাই চ্যানেল একের পর এক ভয়ংকর উত্তর সমুদ্র জয় করেছে সায়নী। এবার সায়নের মুকুটে নতুন সাফল্য নিউজিল্যান্ডের কুক প্রণালী। এই কুক প্রণালী জয় করেই বাংলা তথা ভারতের মুখ উজ্জ্বল করলেন ২৬ বছরের সায়নী (Sayani)। 

পূর্ব বর্ধমান জেলার কালনা শহরের বারুইপাড়ার বাসিন্দা সায়নী। ছোটবেলা থেকেই তার স্বপ্ন সাঁতারু হওয়ার। ‌ সায়নের বাবা রাধে শ্যামবাবু একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। ছোটবেলায় বাবার কাছ থেকেই সাঁতারের হাতেখড়ি হয়েছিল সায়নীর। তারপর পাড়ার সুইমিং পুল পুকুর তারপর গঙ্গা সর্বত্র দাপিয়ে বেড়াতেন সায়নী।

২০১৭ সালের প্রথম ইংলিশ চ্যানেল জয় করেন। তারপর থেকে এই সপ্তসিন্ধু জয়ের স্বপ্নে বুক বাঁধেন সায়নী। ‌ সেই লক্ষ্য নিয়েই সায়নী কঠোর অনুশীলন নিতে শুরু করেন। ২০১৮ সালে অষ্ট্রেলিয়ার রটনেস্ট চ্যানেল ২০১৯ এ ক্যাটালিনা জয় করেন সায়নী। তারপর ২০২২ সালে এশিয়ার মহিলা সাঁতারু হিসেবে আমেরিকার হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের মালোকাই চ্যানেল জয় করে আসেন সায়নী।

বিদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে নিজের মুকুটে নতুন পালক নিয়ে ফেরেন বর্ধমানের মেয়ে। মঙ্গলবার নিউজিল্যান্ডের স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ২২ মিনিট । সে সময় ওয়েলিংটন থেকে শুরু হয় সায়নীর যাত্রা। উত্তাল সমুদ্রে হার কাঁপানোর ঠান্ডা জল বেয়ে এগিয়ে যেতে থাকে সায়নী, সায়নীর পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় বৃষ্টি। প্রণালীর মোট দৈর্ঘ্য ২৭ কিলোমিটার হলেও ৩০ কিলোমিটার সাঁতার কাটতে হয় সায়নীকে। প্রবল বৃষ্টি আর ঢেউয়ের ধাক্কা পথভ্রষ্ট করে দিচ্ছিল সায়নীকে। অবশেষে ১১ ঘণ্টা ৫১ মিনিট ধরে সাঁতার কেটে সায়নী পৌঁছয়ে ফিনিশিং পয়েন্ট আরাপাওয়াতে। উত্তাল সমুদ্রের বরফ গলা জল এতটাই ঠান্ডা ছিল, কিছুক্ষণের শ্বাসকষ্ট শুরু হয় সায়নীর। তবে এখান থেকে ফিরে যাওয়া মানে, এতদিনের সমস্ত আশা, পরিশ্রম নষ্ট হয়ে যাওয়া।

শ্বাসকষ্ট নিয়েই ৩০ কিলোমিটার সাঁতার কাটেন সায়নী। ফিনিশিং পয়েন্ট পৌঁছাতেই শরীর ছেড়ে দেয় তার। সায়নী বলেছেন, ‘সমুদ্রের জল এতটাই ঠান্ডা ছিল যে কিছুক্ষণের মধ্যেই হাত পা অবশ হয়ে যাচ্ছিল। তারপর জোয়ারের কারণে একের পর এক বড় ঢেউয়ের ধাক্কায় বেশ কয়েকবার লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে গেছিলাম।’ এমনকি ফিনিশিং পয়েন্ট বুঝতেও অসুবিধা হচ্ছিল উত্তাল ঢেউয়ে। জেলিফিশ গায়ে লাগছিল হাঙরের ভয় পাননি সায়নী।‌ দেশের মুখ উজ্জ্বল করতে নানা বিপদকে পিছনে ফেলে জয় ছিনিয়ে এনেছে বাংলার মেয়ে। কুক স্ট্রেট চ্যানেলে নিজের শরীরকে মানানোর জন্য প্রতিদিন এক দু’ঘণ্টা আর সমুদ্রেই প্র্যাকটিস করতেন সায়নী। নিউজিল্যান্ডের ম্যারাথন সুইমিং ফেডারেশন কো-অর্ডিনেটর ফিলিপ রাসের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা করে তিনি জেনে নিয়েছিলেন সমুদ্রের সমস্ত খুঁটিনাটি।

সায়নীর সাথে এই মুহূর্তে নিউজিল্যান্ডে রয়েছে তার গর্বিত মা-বাবা। শীঘ্রই দেশে ফিরবেন তারা। এত বড় সাফল্যের পর সায়নী বলছেন, দেশে ফিরে আলু সেদ্ধ ভাত খেতে চান, এরপর বিশ্রাম নেবেন তিনি। কারণ কুক প্রণালীর মত কঠিন মানসিক চাপে এর আগে সায়নীকে পড়তে হয়নি। সায়নীর সামনে এখন চ্যালেঞ্জ নর্থ চ্যানেল। জুগারু ও জিব্রাল্টার প্রণালী। তারপরই সায়নীর মাথায় উঠবে সপ্তসিন্ধু জয়ের মুকুট। 

RELATED Articles