বঙ্গ রাজনীতিতে কেন‌ও এত দাপুটে শুভেন্দু? তাঁর দলত্যাগ কতটা প্রভাব ফেলতে পারে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে? চলুন দেখে নেওয়া যাক

গতকাল‌ই তৃণমূলী রাজনীতিতে বিশাল পট পরিবর্তন হয়েছে। দল ছেড়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অন্যতম বিশ্বস্ত সৈনিক শুভেন্দু অধিকারী। তৃণমূলের সঙ্গে যাঁর এতদিন আত্মিক যোগাযোগ ছিল। দীর্ঘ ২১ বছরের সম্পর্ক ছিন্ন করে এবার বিজেপির নতুন মুখ তিনি।
কংগ্রেসী ঘরানার পাট তুলে দিয়ে এবার কাঁথির শান্তিকুঞ্জের বাসিন্দা শুভেন্দু অধিকারী নরেন্দ্র মোদীর দলের অন্যতম যোদ্ধা হতে চলেছেন।
তবে কংগ্রেসের রাজনীতিতে অধিকারী পরিবারের দাপটে একেবারে কমে যাচ্ছে তা নয়। শুভেন্দুর বাবা শিশির অধিকারী ও তিন ভাই এখন‌ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শিবিরেই রয়েছেন। কিন্তু এই পারিবারিক রাজনীতিতে শুভেন্দু অধিকারীর দাপটই সবচেয়ে বেশি বলে মনে করা হতো।
প্রসঙ্গত, এর আগেও বহু বরিষ্ঠ তৃণমূল নেতা ঘর বদলে বিজেপিতে গেছেন। তালিকা বেশ দীর্ঘ‌ও বটে। মুকুল রায় থেকে শুরু করে শোভন চ্যাটার্জি, অর্জুন সিং তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগদান নতুন কোনও ব্যাপার না।
তবে এবার নতুনত্ব একটাই, শুভেন্দুর মতো বড় মাপের নেতা আগে পায়নি বিজেপি।
কিন্তু সবার থেকে কেন‌ও আলাদা শুভেন্দু অধিকারী? কেন‌ই বা মনে করা হচ্ছে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে তাঁর দল পরিবর্তন ভোটের ফলাফলে বিশাল বড় প্রভাব ফেলতে পারে?
তাহলে চলুন পরিচিত হই বাংলার রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র শুভেন্দু অধিকারী সঙ্গে।
১৯৭০ সালের ১৫ই ডিসেম্বর জন্ম শুভেন্দুর। মা গায়ত্রী অধিকারী। বাবা শিশির অধিকারী। ছোট থেকেই রামকৃষ্ণ মিশনের সঙ্গে যোগাযোগ। কিছুদিন আরএসএস শাখায় অংশ নিয়েছেন শিশির বাবুর মেজ ছেলে। কলেজে যোগ দিয়ে ছাত্র পরিষদ। সেই শুরু।
আটের দশকের শেষ দিকে কংগ্রেসি রাজনীতির তরুণ তুর্কি নেতা লড়েন মিউনিসিপ্যালিটি ভোটে। প্রথম লড়াইয়েই যুদ্ধ জয়। সেই প্রথম পা দেওয়া নির্বাচনী রাজনীতির ময়দানে। কিন্তু বাংলার রাজনীতিতে প্রত্যেকটা দিনই শুভেন্দু লড়াই করে এগিয়েছেন।
২০০১ সালে প্রথমবার পূর্ব মেদিনীপুর জেলার মুগবেড়িয়া বিধানসভায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন শুভেন্দু অধিকারী। তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারের মৎস্যমন্ত্রী কিরণময় নন্দের কাছে হারতে হলেও তাঁর নেতৃত্ব কিরণ ছড়িয়েছিল। ভবিষ্যতের নেতা হওয়ার সম্ভাবনা দেখিয়েছিলেন ৩১ বছরের শুভেন্দু। ২০০৪ সালের লোকসভায় তমলুক থেকে শুভেন্দুকে প্রার্থী করেন বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সামনে সিপিএমের হেভিওয়েট লক্ষ্মণ শেঠ। কিন্তু না, সিপিএমের স্বর্ণযুগে জিততে পারেননি শুভেন্দু।
কিন্তু ধীরে ধীরে পূর্ব মেদিনীপুরের রাজনীতিতে নিজের ছাপ রাখতে শুরু করেন শুভেন্দু।
২০০৭ সালের ৩রা জানুয়ারি। পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রামে শুরু জমি উচ্ছেদ বিরোধী আন্দোলন। কাঁথি কলেজের প্রাক্তন জিএসের জীবন বদলে দিল যে আন্দোলন। ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির ব্যানারে শুভেন্দু অধিকারী হয়ে ওঠেন আন্দোলনের একেবারে প্রথম সারির নেতা। প্রায় ২ বছর ধরে চলা আন্দোলনে এসেছে অনেক উত্থান পতন, রক্ত ঝরেছে বহু। কিন্তু সাহস হারাননি শুভেন্দু অধিকারী।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলেন, নন্দীগ্রাম আন্দোলন কাঁথির শুভেন্দুকে দাপুটে নেতা শুভেন্দু অধিকারী করে তুলতে সাহায্য করেছিল।
সাল ২০০৯। সেই তমলুক লোকসভা। সামনে লক্ষ্মণ শেঠ। কিন্তু এবার আর পরাজিত নয়, প্রায় ২ লক্ষ ভোটে হেভিওয়েট লক্ষ্মণ শেঠকে হেলায় উড়িয়ে দেন তৃণমূল প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী। তারপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি শিশির অধিকারীর মেজ ছেলেকে।
২০১১ সালে রাজ্যে তৃণমূল সরকার তৈরি হয়। শুভেন্দু তখন দিল্লিতে মনমোহন সরকারের জাহাজ দফতরের প্রতিমন্ত্রী। শুভেন্দু আরও বেশি মন দেন সংগঠনে। পূর্ব মেদিনীপুর ছাড়িয়ে শুভেন্দুর দায়িত্বে আসতে থাকে পুরো জঙ্গলমহল। সেই অর্থে প্রথম রাজ্যজুড়ে কাজ শুরু করেন শুভেন্দু।
২০১৬ বিধানসভা ভোটের আগে মমতা নন্দীগ্রাম গিয়েছিলেন। সেখানে ভিড়ে ঠাঁসা সমাবেশে ঘোষণা করেন, নন্দীগ্রাম থেকেই বিধানসভায় পাঠাতে চান শুভেন্দুকে। ২০১৬ সালে নন্দীগ্রামে জিতে বিধানসভায় পা রাখেন শুভেন্দু অধিকারী। ততদিনে শুভেন্দু হয়ে উঠেছেন তৃণমূল সুপ্রিমোর অত্যন্ত আস্থাভাজন। মন্ত্রিসভাতেও ঢুকে পড়েন। যিনি উপস্থিত না হলে মিটিং শুরু করেন না মুখ্যমন্ত্রী।
এরপর‌ই পরিবহণমন্ত্রী হিসেবে কাজ শুরু করেন নন্দীগ্রামের বিধায়ক। সংগঠনের দায়িত্বও ক্রমেই বাড়তে থাকে। নেত্রী শুভেন্দুকে মুর্শিদাবাদের ভার দেন। গোটা বাংলায় একমাত্র মুর্শিদাবাদেই তখনও ছাপ ফেলতে পারেনি তৃণমূল। দায়িত্ব পেয়েই সিরাজের শহরে ঘাঁটি গাড়েন শুভেন্দু। এক নাগাড়ে পড়ে থাকেন অধীর চৌধুরির খাস তালুকে।
ফল মেলে হাতেনাতে। শুভেন্দুর নেতৃত্বে মুর্শিদাবাদে ক্রমশ বড়ো শক্তি হয়ে উঠতে থাকে তৃণমূল।
মুর্শিদাবাদের সাফল্য শুভেন্দুর মুকুটে অন্যতম পালক। এদিকে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মন্ত্রিসভাতেও দায়িত্ব বেড়েছে। পরিবহণের পাশাপাশি সেচ ও জলসম্পদ উন্নয়ন দফতরের মন্ত্রী হন শুভেন্দু। তারপর গঙ্গা দিয়ে অনেক জল বয়ে গেছে। বিভিন্ন ইস্যুতে দলের সঙ্গে মতপার্থক্য হয়েছে, হয়েছে মনমালিন্য। শেষমেশ ২৭ নভেম্বর মন্ত্রিপদ থেকে ইস্তফা।
এক নতুন মোড়ের মুখে দাঁড়িয়ে একসময়ের মমতা ব্যানার্জির সবচেয়ে আস্থাভাজন, বিশ্বস্ত শুভেন্দু। আবার নতুন সংগঠন, নতুন লড়াই।

RELATED Articles