রাজ্য

স্কুলছুট মেধাবী পড়ুয়াদের পাশে দাঁড়ালেন বৃহন্নলারা, বইখাতা উপহার পেয়ে আনন্দে চোখে জল পড়ুয়াদের, জানাল কুর্ণিশ

নিজেদের দিন চালানোর জন্যই এলাকাবাসীর দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয় জলপাইগুড়ি বৃহন্নলা আস্থা ওয়েলফেয়ার সোসাইটির সদস্যদের। পেট চালানোর জন্য অর্থ সংগ্রহ করেন তারা। সেই কাজ করতে গিয়েই তারা জানতে পারেন যে জলপাইগুড়ি দেশবন্ধুগড় উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের কিছু পড়ুয়া রয়েছে যারা অত্যন্ত মেধাবী কিন্তু পরিবারের আর্থিক পরিস্থিতি ভালো না হওয়ার কারণে বই কিনতে পারছে না। এর ফলে মাঝরাস্তাতেই পড়াশোনা ছেড়ে দিতে হচ্ছে তাদের।

পড়ুয়াদের এই করুণ পরিস্থিতিতে প্রাণ কেঁদে ওঠে বৃহন্নলাদের। নিজেদের সামর্থ্য মতো তাদের পাশে থাকার সিদ্ধান্ত নেন তারা। স্থির করেন যে স্কুলছুট ছাত্রীদের বই উপহার দেবেন তারা। ওই স্কুলে যোগাযোগ করে দরিদ্র মেধাবী ছাত্রীদের তালিকা সংগ্রহ করেন। এরপর স্কুলেই এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পড়ুয়াদের হাতে ওই বই তুলে দেন বৃহন্নলারা। এই মহামূল্যবান উপহার পেয়ে কার্যত কান্নায় ভেঙে পড়েন পড়ুয়া ও তাদের অভিভাবকরা।

বৃহন্নলাদের কথায়, “মানুষের দুয়ারে দুয়ারে যাই। কত খবর কানে আসে। জানতে পারি জলপাইগুড়ি দেশবন্ধুনগর উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের বেশ কিছু ছাত্রী রয়েছে যারা অত্যন্ত মেধাবী, কিন্তু পরিবারের আর্থিক সংগতি না থাকায় বই কিনতে পারছে না। এরফলে অনেকেই মাঝরাস্তায় পড়া ছেড়ে দিচ্ছে। তারপরেই আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিই নিজেদের সামর্থ্য মতো এই স্কুলের মেধাবী ছাত্রীদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের বই কিনে উপহার দেব”।

জলপাইগুড়ি নেতাজী পাড়ার বাসিন্দা পেশায় টোটো চালক প্রতাপ সরকার। তিনি জানান যে তাঁর স্ত্রী এবং দুই মেয়েকে নিয়ে রাজস্থানের একটি কোম্পানিতে হিসাব রক্ষকের কাজ করতেন। তাঁর দুই মেয়ে সেখানকার ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়ত। কিন্তু করোনাকালে লকডাউন হয়ে যাওয়ার পর কাজ হারান তিনি। এরপর পরিযায়ী শ্রমিকদের সঙ্গে তিনি জলপাইগুড়ি ফেরত চলে আসেন। বর্তমানে টোটো চালিয়ে খুব কষ্টে সংসার চালাচ্ছেন। তার পক্ষে দুই মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে সরকারি বইয়ের বাইরে বাড়তি বই কিনে দেওয়া কার্যত অসম্ভব ছিল। বৃহন্নলাদের এই দান তার মেয়েদের পড়াশোনা এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে।

স্কুলের ছাত্রী তথা প্রতাপ সরকারের কন্যা প্রতিমা সরকার কাঁদতে কাঁদতে বলে যে তার বাবার পক্ষে বই কিনে দেওয়া সম্ভব ছিল না। এই বই পেয়ে আগামীতে সে আরও পড়াশুনা করে ভালো ফল করবে বলে জানায়।

এই বিষয়ে স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা সোমা পাল রায় বলেন, “আমাদের স্কুলের ছাত্রীদের মধ্যে একটা বড় অংশ ফার্স্ট জেনারেশন লার্নার। এরা অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের। এদের অনেকের পক্ষেই স্কুলে ভর্তির জন্য ২৪০ দেওয়া অসম্ভব। আমাদের দিদিমণিরা অনেকের ভর্তির টাকা দেওয়া সহ অন্যান্য কাজ করে থাকেন। এদের পক্ষে ভালো ফল করার জন্য অতিরিক্ত বই কেনা অসম্ভব। তাই অনেকেই মাঝ পথে পড়া বন্ধ করে দেয়। ফলে ড্রপ আউটের সংখ্যা বাড়ে। এদের অসহায় অবস্থার কথা জানতে পেরে বৃহন্নলা ওয়েলফেয়ার সোসাইটির সদস্যরা এবার যেভাবে এদের পাশে দাঁড়ালো তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। নইলে এরাও হয়তো ড্রপ আউট হয়ে যেত। পিপাসা দেবী আজ থেকে এদের সকলের মা হয়ে গেলেন। আমরা এদের কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকব”।

Back to top button
%d bloggers like this: