বাবা ড্রাইভার, মায়ের ব্রেন স্ট্রোক বাবা মাকে ভালো রাখতে ঠেলায় করে খাবার বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছে মাস্টার্স করা মেয়েটা। নাম কেয়া ব্রহ্ম। সোদপুরের সুখচর কবিরাজ বাড়ির মোড়ে ফুড রিচার্জ নামে একটি ছোট্ট খাবারের দোকান চালায় মেয়েটি। একটা ছোট ঠেলাগাড়ি তাতেই সেই দোকান। সকালের জলখাবার থেকে দুপুরের মাছ ভাত সবই পাওয়া যায় সেই দোকানে। অসুস্থ মাকে নিয়ে জীবন যুদ্ধে লড়ে যাচ্ছে বছর ত্রিশের কেয়া।
বর্তমানে আমরা সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেক মানুষকেই ভাইরাল করে সেলিব্রেটি বানিয়ে ফেলেছি, তবে সত্যিই বোধহয় যাদের দরকার ছিল তারা সেই ক্যামেরার আলোতে এসে পৌঁছায়নি। সবাইকে অনুপ্রেরণা দেওয়ার মত কাজ করে চলেছেন যারা তাদের সামনে আনা দরকার। এমনই একজন কেয়া ব্রহ্ম।
সোদপুরের সুখচর পঞ্চাননতলা রোডের বাসিন্দা কেয়া। ছোটবেলা থেকেই অভাবে মানুষ হয়েছেন কেয়া। তার বাবা কাঞ্চন ব্রহ্ম পেশায় গাড়ি চালক। তিনি ভাঁড়ার গাড়ি চালিয়ে কেয়া-কে ও তার দাদাকে মানুষ করেছেন। কেয়ার দাদার তার থেকে দশ বছরের বড়। কেয়ার মা একজন গৃহবধূ, তার হার্টেও একটা ব্লক রয়েছে। কেয়া উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেছে সোদপুরের সুখচর শতদল হাই স্কুল থেকে। ভিক্টোরিয়া ইনস্টিটিউট থেকে সংস্কৃতে অর্নাস নিয়ে গ্রাজুয়েশন করেছেন। কিন্তু গ্রাজুয়েশনের পর তার বাবার পক্ষে তাকে পড়ানো আর সম্ভব হয়নি। তবে কেয়ার ছোটবেলার ইচ্ছা মাস্টার্স করা। তাই ছাত্র পরিয়ে টাকা জমিয়ে রবীন্দ্রভারতী থেকে সংস্কৃতিতে মাস্টার্স কমপ্লিট করেছেন।
মাস্টার্স করেও চাকরি পাননি কেয়া। তাই কেয়ার মা তার সমস্ত সোনা বন্ধক দিয়ে মেয়েকে মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ পড়িয়েছেন। সেই কোর্স করে একটা বেসরকারি অফিসে চাকরি পেলেও অল্প কিছুদিনেই সেখান থেকে বহু কর্মীকে ছাটাই করে দেওয়া হয়। এদিকে বাড়ির অর্থনৈতিক অবস্থা ধীরে ধীরে খারাপ হতে শুরু করে। কেয়া থেমে থাকেননি লোন নিয়ে স্কুটি কিনে। রেপিডো চালিয়ে সংসারের পাশে থাকার চেষ্টা করেছে। আশেপাশের লোকের বহু কথাই তাকে শুনতে হয়। ফের একটু জায়গায় চাকরি করতে শুরু করেন কেয়া। কারণ তখন বাবা মায়ের সব দায়িত্ব মেয়ে কেয়ার কাঁধে। অফিস যাওয়ার পথেই অ্যাক্সিডেন্ট হয় কেয়ার। কেয়া-র এক্সিডেন্ট এর খবরেই ব্রেন স্ট্রোক হয় তার মায়ের।
স্কুটির লোন, বাবাকে রেস্ট দেওয়ার লক্ষ্যেই চাকরির পেছনে না দৌড়ে এবার নিজে কিছু করার ভাবনা নেন কেয়া। এরপরই সুখচর পোস্ট অফিসের সামনে ফেলায় করে একটি খাবারের দোকান দেন কেয়া। যেখানে ন্যায্য দামে সকালের জল খাবা থেকে উপরের মাছভাত সবই পাওয়া যায়। দোকানে আরো কিছুটা বেশি লোক আসলে তার বাবাকে এসে আর গাড়ি চালাতে দেবে না এটাই তার ইচ্ছা। তার ব্যবহারে সন্তুষ্ট হয়ে অনেক লোকেই তাকে সাহায্য করেছে রাস্তায় খাবারের গাড়িটি দেওয়ার জন্য। অনেকেই তার খাবার টেস্ট করেছেন। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে ভাইরাল না হলেও কেয়াকে চিনেছে কেউ কেউ।





