জীবন অন্ধকার করেনি অন্ধত্ব! দৃষ্টিহীন হয়েও প্রতিদিন পথের দিশা দেখান হাজার হাজার মানুষকে, নারী দিবসে সেই হার না মানা সবিতাকে কুর্ণিশ

ইচ্ছা থাকলে কোন কিছু বাধ সাজতে পারেনা। তেমনই এক নিদর্শন সবিতা। অন্ধত্ব বাধা হতে পারেনি সবিতার জীবনে। বাধা অতিক্রম করে তিনি আজ হয়ে উঠেছেন আইডল। অনেকের কাছে অনুপ্রেরণা তিনি। সবিতার কাহিনী চমকে দেবে আপনাকেও। বাকি সবার মতো নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে সংসারের হাল ধরতে চেয়েছিলেন সবিতা। ভাগ্যের পরিহাসে জীবন‌ বদলে যায়। জীবনে নেমে আসে অন্ধকার। অন্ধকারকে দুর্বলতা না ভেবে পথ দেখানোর মাধ্যম হিসেবে লড়াই করতে থাকেন। মছলন্দপুরের শক্তিনগরে বাসিন্দা সবিতা হালদার।

নানা প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে জীবনে সফলতার শীর্ষে পৌঁছেছেন সবিতা। শত শত চ্যালেঞ্জকে অতিক্রম করে সবিতা আজ হয়ে উঠেছেন মানুষের অনুপ্রেরণা। জানা গিয়েছে, যুবকের প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন একসময়। সেই প্রতাখ্যান স্বরূপ পেতে হয় কঠিন শাস্তি। তার জেরেই দৃষ্টিশক্তি হারাতে হয় সবিতাকে। উত্তর ২৪ পরগনার মছলন্দপুরের শক্তিনগরের বাসিন্দা সবিতা। ভূদেব স্মৃতি গার্লস স্কুল থেকে তার মাধ্যমিকে উত্তীর্ণ হন। একাদশ শ্রেণিতে পড়ার সময় এক যুবকের প্রেমের প্রস্তাব ফেরান সবিতা। সেই রাগ বশত প্রতিবেশী যুবক তাকে প্রতিশোধ নেন।

প্রতিবেশী যুবক একদিন সবিতার ঘরে ঢুকে সবিতার চোখে বালি ছুঁড়ে দেয়। এরপর দুচোখে পেরেক বিঁধে সেখান থেকে পালিয়ে যান সেই যুবক। যন্ত্রণায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন সবিতা। তখন তার বয়স সতেরো। দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন তিনি। কীভাবে পড়াশোনা করবেন? নিজের স্বপ্নপূরণ করবেন সেসব ভেবে দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। মেয়ের চোখের দৃষ্টি ফেরাতে অনেক চেষ্টা করেন তার বাবা-মা। অনেক হাসপাতাল ঘুরেও কোন সুরাহা হয়নি। ফলাফল কিছু না মেলায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। চিকিৎসকরা জানিয়ে দেন হারানো দৃষ্টিশক্তি কখনও ফেরত পাবেন না সবিতা। সেসব শুনে দুঃখের শেষ ছিল না সবিতার। কাঁধ শক্ত করে শুরু হয় নতুন লড়াই।

অন্ধত্বের কাছে হার না মেনে লড়াইয়ে নামেন সবিতা। সবিতার বাবা মন্মথ হালদার। পেশায় তিনি একজন সবজি বিক্রেতা। তার মা গৃহবধূ। মধ্যবিত্তের সংসারে ঘটনার পর পরিবারে নেমে আসে আর্থিক সঙ্কট। যেটুকু সঞ্চয় ছিল তার সুবিতার দৃষ্টি শক্তি ফেরাতে বিভিন্ন হাসপাতালে ফুরিয়ে যায়। সঞ্চয়ের ভাণ্ডার শেষ হয়ে যায়। বাধা সত্ত্বেও রেলের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন সবিতা।

হাওড়া স্টেশনে যাত্রীদের পথ দেখাতে ঘোষকের ভূমিকায় চাকরি মেলে সবিতার। প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রীকে পথ বলে দেন এই অন্ধ ঘোষক সবিতা। মায়ের সঙ্গে হাওড়া স্টেশনে অফিস আসেন। ‌মোবাইল অ্যালার্ট শুনে, জটিল ব্রেইল পদ্ধতি রপ্ত করে অফিসের সব কাজ নিজের হাতে সামালায় সে। সবিতার বাড়িতে রয়েছেন বাবা-মা-ভাই-ভাইয়ের স্ত্রী। সবিতার চাকরি দিশা দেখিয়েছে এই সেই পরিবারে। দৃষ্টিহীন সবিতা এখন অনুপ্রেরণা হাজারো মানুষকে।

সবিতার বাবা-মায়ের বক্তব্য, “তার অসীম সাহস এবং দৃঢ় সংকল্প আজ সবিতাকে তার লক্ষ্য অর্জনে সাহায্য করেছে। স্কুলে বরাবরই ভাল ছাত্রী হিসাবে পরিচিত ছিল সে। আমাদের অনেক আশা ছিল যে একদিন ও বড় অফিসে চাকরি করবে। আজ ও চোখে দেখতে না পেলেও ইচ্ছাশক্তিতে ভর করে লক্ষ্য অর্জন করেছে”।

RELATED Articles