‘আস্তে লেডিস কোলে বাচ্চা নয়’, বরং এবার ‘আসতে লেডিস, হাতে স্টিয়ারিং’ বলা প্র্যাকটিস করা শিখুন। চিরকাল আমাদের এই পুরুষশাসিত সমাজ আমাদের শিখিয়ে এসেছে যে নারী মানেই তাঁকে সংসার ঠেলতে হবে, স্বামীর যত্ন নিতে হবে আর বাচ্চা মানুষ করতে হবে। কিন্তু সেখানেই কী একজন নারীর সম্মান পরিণতি পায়?
এখন সমাজ অনেক বদলেছে। পুরুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নারীরা প্রমাণ করেছে তারাও কোনও অংশে কম নয়। আর ‘কোলে বাচ্চা’ যে কোনও নারীর কাছে দুর্বলতা নয়, বরং সবচেয়ে বড় গর্ব ও শক্তিশালী হওয়ার প্রতীক, তা একজন মা-র থেকে ভালো আর কেই বা জানবেন।
সন্তানের জন্য মায়েরা ঠিক কী কী করতে পারেন, তা হয়ত ঠিক ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। অনেক সময় বাসের স্টিয়ারিংও ধরেন মা। যেমনটা করেছিলেন বেলঘরিয়ার প্রতিমা পোদ্দার। কলকাতার প্রথম মহিলা বাসচালক ইনি। নিমতা-বেলঘরিয়া-হাওড়ার রাস্তার মিনিবাস চালান প্রতিমাদেবী।
তবে যাত্রীর আসন থেকে চালকের আসনে পৌঁছনোর লড়াইটা একেবারেই কিন্তু সহজ ছিল না তাঁর। বিয়ের পর উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেন প্রতিমাদেবী। ২০০৬ সালে প্রথম লাইসেন্স পান তিনি। শুধু বাসই নয়, এর আগে অ্যাম্বুলেন্সও চালিয়েছেন তিনি, করেছেন বাসের কন্ডাক্টারিও। কিন্তু স্বামী অসুস্থ হয়ে তিন-চারমাস ঘরে বসে থাকায় নিজেই স্টিয়ারিং হাতে নেন প্রতিমাদেবী।
প্রথমের দিকে বাসে মহিলা চালক দেখে হতবাক হয়ে যেতেন অনেকেই। অনেকেই আবার মহিলা চালক দেখে বাস থেকেই নেমে যেতেন। কেউ কেউ ভুগতেন আতঙ্কে। নিজের এমন সব অভিজ্ঞতার কথা নিজেই জানান প্রতিমাদেবী। প্রথমের দিকে বাকি বাসচালকদের থেকেও নানান গঞ্জনা শুনতে হয়েছে তাঁকে। তাঁকে গাড়ি চালাতে দেবে না বলে হুমকিও শানান পুরুষ বাসচালকরা। এমনকি, তাঁকে এও পর্যন্ত শুনতে হয়েছে যে তিনি মহিলা বলে তাঁর বাসে বেশি যাত্রী উঠবে, তাই তিনি এই কাজ করছেন।
তবে বাইরের লোক যাই বলুক না কেন, নিজের এই সিদ্ধান্তে তিনি সবসময় পাশে পেয়েছেন তাঁর স্বামী ও দুই মেয়েকে। একজন মহিলা যেমন তাঁর স্বামীর পাশে থাকেন, তেমনভাবেই তাঁর স্বামীও সবসময় তাঁর পাশে থেকেছেন। মানুষ করেছেন দুই কন্যাসন্তানকে। ছোটো থেকেই দুজনকে খেলা শিখিয়েছেন। তাঁর দুই মেয়েই এখন জাতীয় স্তরে খেলে। তিনি এও জানান যে কখনও কখনও তাঁর স্বামী গাড়ি চালালে তিনি কন্ডাক্টারের ভূমিকা সামলান।
আসলে, আমরাই তো সমাজের নিয়ম বানিয়েছি। আমরাই ঠিক করে দিয়েছি মেয়েরা ঘরে বসে সংসার-সন্তান সামলাবে, আর পুরুষরা বাইরে কাজ করবে। কিন্তু এখন সেই ভুলভ্রান্তি ভাঙার সময় এসেছে। সেই চিরাচরিত প্রথা এক এক ভাঙছেন প্রতিমা পোদ্দারের মতো মহিলারা। সমাজের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন, ‘আমরাও সবটাই পারি’। তাই প্রতিমাদেবীও আশা রাখেন যে ভবিষ্যতে এমনভাবে তাঁর মতোই আরও মহিলারা এমন পেশায় যুক্ত হবেন। তাঁর কথায়, এতে যেমন দুর্ঘটনার পরিমাণ কমবে, তেমন অনেক সংসার সচ্ছল হবে।





