কুর্ণিশ! নিজের সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরোয় অবস্থা, কিন্তু সুন্দরবনের দুঃস্থ ছাত্র-ছাত্রীদের বিনামূল্যে পড়ান যুবক, ভর্তি করেন স্কুল-কলেজেও

Soumitra Mondal: লোকে বলে নেশা খুবই খারাপ জিনিস। কিন্তু দুঃস্থ ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার নেশার কথা শুনেছেন কখনও? তীব্র গরমেও রোজ তিনবার নদী পেরিয়ে, আড়াই ঘণ্টা, সাইকেল চালিয়ে বিনা পয়সায় পড়াতে যান। ৭৬ জন দুঃস্থ ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার ব্যবস্থা করে নজির গড়েছেন সুন্দরবন গোসাবা ব্লকের বালি দ্বীপের বাসিন্দা সৌমিত্র মন্ডল (Soumitra Mondal)। প্রতিবছর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের রেজাল্ট বেরনোর পরে ফুরসত পাননা তিনি। সেই সময় সৌমিত্র খুঁজে বের করতে থাকে সুন্দরবন গোসাবা ব্লকের প্রত্যন্ত গ্রামের দুঃস্থ ছাত্র-ছাত্রীদের। যারা পয়সার অভাবে স্কুল কলেজে ভর্তি হতে পারছে না। তাদের খুঁজে বের করে টাকা-পয়সার সংস্থান করে দেন সৌমিত্র। ‌ নিজে ভাড়া বাড়িতে থেকে লোকের মাথায় ছাদ তুলে দিতে আনন্দ পান বছর ৩৩-এর সৌমিত্র মন্ডল (Soumitra Mondal)

ছোটবেলা থেকেই অবহেলায় বেড়ে উঠেছেন সৌমিত্র (Soumitra Mondal)। মাথার উপর বাবা-মা থাকলেও নুন আনতে পান্তা ফুরানোর সংসারে জায়গা হয়নি সৌমিত্রর‌। তাই ছোটবেলা থেকেই আত্মীয় পরিজনদের বাড়িতে মানুষ হয়েছেন তিনি। কখনো পিসির বাড়ি, কখনো মাস্টার মশাইয়ের বাড়ি, কখনো আবার মামার বাড়ি এমনভাবেই দিন কেটেছে। তবে লোকের বাড়িতে থাকার খাওয়া অনেক সমস্যার। তাই সে সময় পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়াই সৌমিত্রর কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ২০১০ সালে পিসির বাড়িতে থেকে সুরেন্দ্রনাথ কলেজ থেকে ভূগোলে অনার্স করেন। তবে সে কারোর ওপরই দায়বদ্ধ হতে চাই ছিল না। কলেজ শেষের পরই একটা কাজ খোঁজা শুরু করে সৌমিত্র। কাজ পেয়েও যান।

‌সুন্দরবনের কচুখালি দ্বীপের মম্মথপুর হাই স্কুলে পার্ট টাইম ভূগোল পড়ানোর শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হন তিনি। মাইনে ৩০০০ টাকা, স্কুলের হোস্টেলে থাকা-খাওয়া ফ্রি। স্কুলের অবসরে বহু দুঃস্থ ছাত্র ছাত্রীদের পড়াতে শুরু করেন সৌমিত্র (Soumitra Mondal)। সৌমিত্র (Soumitra Mondal) নিজের পয়সার অভাবে যেমন তার শিক্ষকদের মাইনে দিতে পারেনি, তাই সৌমিত্র ছাত্র ছাত্রীদের থেকেও এক পয়সা নেন না তিনি। মাধ্যমিক উচ্চ মাধ্যমিকের রেজাল্ট বেরোলে গোসাবা ব্লকের নটি দ্বীপের ছাত্র-ছাত্রীদের খুঁজেই তাদের স্কুলে বা কলেজে ভর্তির ব্যবস্থা করেন সৌমিত্র (Soumitra Mondal)।

এমনকি স্কুল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে স্কুলের ফি মকুবের চেষ্টা করেন তিনি। আবার সোশ্যাল মিডিয়ায় এই সকল দুঃস্থ ছাত্র-ছাত্রীদের সাহায্যের আবেদন জানান তিনি। সোশ্যাল মিডিয়ায় কোন সহৃদয় ব্যক্তি যোগাযোগ করলে তাকে সরাসরি ওই ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে যোগাযোগের ব্যবস্থা করে দেন সৌমিত্র নিজেই। কখনো বা স্কুল আবার দুঃস্থ পড়ুয়াদের ওদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের নাম্বার পাঠিয়ে সাহায্যের আবেদন করেন সৌমিত্র (Soumitra Mondal)। এভাবেই গত ক’বছর ধরে সুন্দরবনের গোসাবা ব্লকের দুঃস্থ ছাত্রছাত্রীদের ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছেন তিনি।

দুর্ভাগ্যবশত কোভিডের আগে সৌমিত্রর (Soumitra Mondal) পার্টটাইম স্কুলের চাকরিটা চলে যায়। ছাত্র-ছাত্রীরা আজও তাকে ছাড়েনি। তাদের জন্যই ঝড়-জল উপেক্ষা করে আড়াই ঘন্টা সাইকেল চালিয়ে তাদের প্রাইভেট পড়াতে চান সৌমিত্র (Soumitra Mondal)। গোসাবা ব্লকের তরফে সৌমিত্রকে পুরস্কৃত করা হয়েছে। এছাড়াও করোনা সময় সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য আমাদের দেশের ভাইস প্রেসিডেন্ট এর কাছ থেকে কোভিড ১৯ হিরো সম্মানে ভূষিত হয়েছেন সৌমিত্র। এই মুহূর্তে সৌমিত্র সত্যনারায়নপুর বিবেকানন্দ বিদ্যাভবনে শিক্ষকতা করছেন। বহু সহৃদয় ব্যক্তির আশীর্বাদে ফেরিওয়ালা নামক একটি এনজিও চালান তিনি। সৌমিত্র এখনও পর্যন্ত ১১ জন ছাত্রছাত্রীকে স্কুল কলেজে ভর্তির ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। সৌমিত্রর (Soumitra Mondal) এনজিওর দৌলতে অনেক ছাত্র-ছাত্রীরা এই কেউ নার্সিং পড়ছে কেউ এমফিল করছে। এছাড়াও গ্রামের অনেককে পাকা বাড়ি শৌচালয় করে দিয়েছে সৌমিত্র।

RELATED Articles