সংক্রমন রুখতে লকডাউন খুব বিশেষ কার্যকরী নয়, বলছে বিশ্ব স্বাস্হ্য সংস্থার বিশেষজ্ঞরা

সংক্রমন রুখতে দেশে প্রথম পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল বড় কোনো জমায়েতকে রদ করে। কিন্তু তাতেও যখন এই রোগের প্রভাব দেখা দিতে লাগল তখন ধীরে ধীরে স্কুল-কলেজ, অফিস, দোকানপাট সবই বন্ধের নির্দেশ এলো।বিয়ে-শেষকৃত্য থেকে পুজো যেকোন সামাজিক, রাজনৈতিক কিংবা ধর্মীয় অনুষ্ঠানেও লাগল নিষেধাজ্ঞা। ভারত-সহ বিশ্বের প্রায় ৩২টি দেশকে সংক্রমন থেকে বাঁচাতে লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। তবে শুধুমাত্র লকডাউন জারি করে সংক্রমণ ঠেকানোর এই প্রক্রিয়া কি সত্যিই লাভজনক হবে? সেই প্রশ্নের উত্তর জানালেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (হু) এমার্জেন্সি এক্সপার্ট মাইক রায়ান।

তিনি বলেন জমায়েত বন্ধ করে শুধু একে অপরের থেকে দূরে রাখা যেতে পারে। কিন্তু সংক্রমন বন্ধ করবে কি করে? লকডাউন মন্দ নয়, তবে খুব একটা কার্যকরীও নয়। তাঁর মতে, সার্স-সিওভি-২ এর মতো প্রাণঘাতী ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে গেলে সবার আগে দরকার স্বাস্থ্য পরীক্ষা। কোনও মানুষ আক্রান্ত কিনা সেটা খুঁজে বার করতে হবে তারপর শীঘ্র তাঁকে আইসোলেশনে পাঠাতে হবে। সেই টেস্টের ভিত্তিতে তার চিকিৎসা শুরু করতে হবে তবেই রোগ আটকানো সম্ভব। যদি সংক্রমনকারীকে ধরতেই না পারি তাহলে তাঁর থেকেই সংক্রমণ ছড়াবে বাকিদের মধ্যে। তখন লকডাউন করে সব পরিষেবা বন্ধ করেও লাভ নেই। কারণ ভাইরাস ভেতরে ভেতরে তার দাপট দেখিয়ে যাবে। তাঁর মত, এমনও হতে পারে ভাইরাসের উপসর্গ কারোর মধ্যে ধরা পড়েনি (Asymptomatic)। লকডাউনের কারণে তিনি পরিবারের বাকিদের সঙ্গে একই বাড়িতে বন্দি রইলেন। পরে দেখা গেল সেই পরিবারের সকলের মধ্যেই সংক্রমণ ছড়িয়েছে। কাজেই ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে সবচেয়ে জরুরি ল্যাব-টেস্ট।

বিটা-করোনাভাইরাসের এই ভয়ঙ্কর ভাইরাল স্ট্রেন সার্স-সিওভি-২ কে বিশ্বজোড়া মহামারী ঘোষণা করেছে হু। এই ভাইরাসের সংক্রমণে সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটারি সিন্ড্রোমে আক্রান্ত হন রোগী, যাকে বলা হয় সিওভিআইডি-১৯ (COVID 19) ।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, মানুষই এখন ভাইরাসের ধারক ও বাহক (Human to Human transmission)।ভারতে না হলেও বিশ্বের অনেক দেশেই স্টেজে ৩ বা Community Transmission শুরু হয়ে গেছে। আর সেই ভয়াবহতা দেখেই আমাদের সরকার নির্দিষ্ট সময়ের জন্য দেশে লকডাউন ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছেন।গণপরিবহন বন্ধ, জরুরি পরিষেবা বাদে সমস্তরকম পরিষেবা বন্ধ, ঘরের বাইরে বার হওয়া নিষেধ।

হু-এর আধিকারিক মাইক রায়ান বুঝিয়ে বলেছেন, জনসাধারণের স্বাস্থ্যের কথা ভেবে শুধু লকডাউনেই যে সমস্যা মিটবে না এটা আগে বুঝতে হবে। যদি কারোর মধ্যে রোগ থেকে যায় তখন লকডাউন উঠে যাওয়ার পরেও দেখা যাবে মানুষের মধ্যেই সুপ্ত হয়ে থাকা ভাইরাসের সংক্রমণ ফের মাথাচাড়া দিয়েছে। তখন পরিস্থিতি আরও ভয়ানক হবে। সেই সংক্রমণ ফের মহামারী হয়ে ছড়িয়ে পড়বে সকলের মাঝে।

করোনা রুখতে দরকার ‘পরীক্ষা, পরীক্ষা পরীক্ষা’, ব্যতীত কোনো উপায় নেই এই বার্তা দিয়েছিলেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)-এর ডিরেক্টর জেনারেল টেডরস অ্যাডহানম ঘেব্রেইসাস। তিনি বলেছিলেন, রোগ পুষে রাখলেই লাগামছাড়া হবে। তাই সতর্কতা দরকার খুব। উপসর্গ যতই সামান্য হোক ‘টেস্ট’ করালেই ধরা পড়বে ভাইরাস, চিকিৎসাও শুরু হবে তাড়াতাড়ি। সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আগেই তাকে চিনে নিতে হবে। টেস্ট ছাড়া কোনওদিনই ধরা পড়বে না ভাইরাস। শুধুমাত্র সংক্রমণ সন্দেহ হলেই কোয়ারেন্টাইনে পাঠিয়ে ফেলে রাখার মানে নেই। সামান্য উপসর্গ দেখা গেলেও সঙ্গে সঙ্গেই রক্ত, থুতু, লালা বা দেহরসের নমুনা ল্যাবোরেটরিতে টেস্ট করা দরকার। তাহলেই জানা যাবে ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়েছে কিনা এবং আক্রান্ত ঠিক কোন স্টেজে রয়েছেন। আর এই ভাবে সংক্রমণ সারা শরীরে ছড়াবার আগেই তাকে কিছুটা হলেও রুখে দেওয়া যাবে।

মারণ ভাইরাসের সংক্রমণে বিশ্বজুড়ে মৃতের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ১৩ হাজার। সংক্রামিত ৩ লক্ষ ১৭ হাজারের কাছাকাছি। চিনে এখনো অবধি মারা গেছেন ৩,২৬১ জন। যদিও চিনে ভাইরাসের প্রকোপ অনেকটাই কমেছে বলে দাবি করেছে সে দেশের ন্যাশনাল হেলথ কমিশন। এখন চিনকে ছাপিয়ে মৃত্যু মিছিল বেরিয়েছে ইতালিতে। ভাইরাস আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা ছাড়িয়েছে চার হাজারের বেশি। শুক্রবার থেকে শনিবারের মধ্যে একদিনে মৃত্যু হয়েছে ৭৯২ জনের। শেষকৃত্যের জন্যে নামানো হয়েছে সেনাবাহিনীকেও।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কোনও নির্দেশিকা না মেনেই পারস্পরিক মেলামেশা জারি রেখেছিলেন ইতালির বাসিন্দারা।আর সেই জন্যই এই রোগ এত বিরাট আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। ইতালির পরে স্পেন, ইরান, আমেরিকা, জার্মানি, ফ্রান্স, দক্ষিণ কোরিয়াতে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে মৃতের সংখ্যা।

ভারতে এখনও অবধি আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৩০০ ছাড়িয়েছে মাত্র স্টেজ ২ বা দ্বিতীয় পর্যায়ে (সেখানে কমিউনিটি ট্রান্সমিশন শুরু হয়নি)। আজ ২২ জানুয়ারি সকাল ৭টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত সারা দেশে ‘জনতা কার্ফু’ জারি করেছিল কেন্দ্রীয় সরকার।

সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া রুখতে ইতিমধ্যেই মহারাষ্ট্র, রাজস্থান, গুজরাটের বেশ কিছু শহরে লকডাউন জারি হয়েছে। পুদুচেরিতে জারি হয়েছে ১৪৪ ধারা। সোমবার অর্থাৎ ২৩ মার্চ বিকেল ৫টা থেকে শুক্রবার অর্থাৎ ২৭ মার্চ রাত ১২টা পর্যন্ত এই লকডাউন চলবে বলে নির্দেশ দিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ সরকার। নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী এবং জরুরি পরিষেবার বাইরে ছাড়া বাইরে বেরোতেও বারণ করা হয়েছে।

RELATED Articles

Leave a Comment