হারিয়েছেন ৮৫ শতাংশ দৃষ্টিশক্তি, হতে পারেন নি মা, তবুও প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে আজ কয়েকশো বাচ্চার মা মন্দিরা, পাশে দাঁড়িয়েছেন বয়স্ক মানুষদেরও

মন্দিরা আচার্যের (Mandira Acharya) ডান চোখ ইতিমধ্যেই ৮৫% খারাপ হয়ে গেছে। বাঁ চোখের আয়ু আর মাত্র দু’বছর। সমস্ত শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে দূরে রেখে মানুষটা কয়েকশো বাচ্চা ও বয়স্ক মানুষদের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছে। স্বামী ছেড়ে চলে গেছে, বাবা মারা গিয়েছে তবে ইচ্ছাশক্তিতে বিন্দুমাত্র খামতি নেই। মন্দিরার জন্ম নদীয়ার কৃষ্ণনগরে। মন্দিরার বাবা অসিত আচার্য পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সমাজ কল্যাণ দপ্তরের একজন সাধারন কর্মী ছিলেন। মা নীলিমা আচার্য ছিলেন গৃহিণী। ‌মন্দিরা দেবীর জীবনে মায়ের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। মায়ের থেকে মনের জোর ও সাহস পেয়েছেন।

ছোটবেলা অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন মন্দিরা (Mandira Acharya)। ১৯৯৬ সালে তৎকালীন রেকর্ড ৬৩ শতাংশ নম্বর নিয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন। হুগলি ওমেন্স কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। তারপর বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। একের পর এক ভালো রেজাল্ট থেকে পৌঁছে দিচ্ছিল তার স্বপ্নের কাছে। কলেজে পড়াকালীন গ্রামের বাচ্চাদের জন্য কিছু করতে চেয়েছিলেন। শহরের উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থা সবসময় গ্রামের বাচ্চাদের পিছনে ফেলে দেয়। এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে নিজে থেকে গ্রামের স্কুলে পোস্টিং চেয়েছিলেন মন্দিরা। এর পিছনে একমাত্র কারণ গ্রামের বাচ্চাদের উন্নত ও আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে পরিচয় করানো।

সব ঠিকই চলছিল। হঠাৎ ছন্দপতন, মন্দিরার (Mandira Acharya) পিটুইটারি গ্রন্থিতে সমস্যা ধরা পড়ে। চিকিৎসকদের কথায় অপারেশন হয়। তবে ভাগ্য সহায় ছিল না। ভুল অপারেশন হওয়ায় ডান চোখে ৪৫ শতাংশ দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন। আবার অপারেশন হয়। বর্তমানে ডান চোখ ৮৫ শতাংশ খারাপ হয়ে গিয়েছে। আর মাত্র দু’বছর রয়েছে বা চোখের আয়ু। শারীরিক অক্ষমতার জন্যই স্বামী ছেড়ে চলে গিয়েছেন‌। তারপর থেকে ছেলেকে একা হাতে মানুষ করছেন। এত কিছু পরেও হাল ছাড়েননি তিনি। ভাইকে সঙ্গে নিয়ে দায়িত্ব নিয়েছেন কয়েকশো বাচ্চা ছেলেমেয়ের। বর্তমানে একাদশ দ্বাদশ শ্রেণীর ভূগোল শিক্ষিকা মন্দিরা। প্রত্যেকদিন স্কুলে যাওয়ার আগে তিনি পৌঁছেছেন আদিবাসী গ্রামে। সেখানে ২৫০ ছেলে মেয়েকে দুধ বিস্কুট খাওয়ান তিনি।

স্কুল থেকে ফিরে এসে কৃষ্ণনগর স্টেশনে না খেতে পাওয়া মানুষগুলোর জন্য রান্না করেন মন্দিরা (Mandira Acharya)। প্রত্যেকদিন ২০ থেকে ৩০ জন মানুষকে খাওয়ান। ভুতপাড়া আদিবাসী গ্রামের কাছে মন্দিরা দেবী মা নামে পরিচিত। এই মা ডাক মন্দিরা শুনতে চান সবার কাছ থেকে। মনের জোর থাকলে শারীরিক অক্ষমতা হার মানে তার উদাহরণ মন্দিরা।

আরও অন্যান্য খবর