মাতৃত্বই বটে! পশুপ্রেম দেখে ছেড়ে গিয়েছে স্বামী, ব্যাঙ্ক থেকে লোন নিয়ে পথপুকুরদের সন্তানস্নেহে দুবেলা পেট ভরে খাওয়ান নীলাঞ্জনা দেবী

ব্যাঙ্ক থেকে লোন নিয়ে গাড়ি বাড়ি কিনতে শুনেছেন, কিন্তু ব্যাঙ্ক থেকে লোন নিয়ে রাস্তার কুকুরদের (Street dogs) খাওয়াতে শুনেছেন? শুনে অবাক হচ্ছেন? রোজ পথ কুকুরদের (Street dogs) দুবেলা ভর পেট খাওয়ানোর জন্য নিজের তিন লাখ টাকার সোনার গয়না বিক্রি করে দিয়েছেন এই মহিলা। নিয়েছেন ব্যাংক থেকে সাড়ে চার লাখ টাকার লোন। এমনকি পশু প্রেমের জন্য ছেড়ে গেছেন তার স্বামী। তবুও ছেড়ে দেয়নি রাস্তার অবলা জীবদের (Street dogs) । ৩৬৫ দিন প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০ পথ কুকুরদের মাংস ভাত খাওয়ান কল্যাণীর বি ব্লকের গৃহবধূ নীলাঞ্জনা বিশ্বাস। বয়স ৫০। এই পশু প্রেমের কারণেই প্রতি মাসে খরচ হয় ৫০ হাজার টাকা। বাড়ির লোক পাড়া-প্রতিবেশী কারোর কথায় কান না দিয়ে পশু প্রেম চালিয়ে গেছেন নীলাঞ্জনা। ‌

এটা এক হার না মানা মায়ের গল্প। যেই মা তার সারমেয় সন্তানদের ভালো রাখতে সর্বস্বান্ত হয়েছেন। তবুও তার সারমেয়দের গায়ে কোন আঁচ লাগতে দেননি। নীলাঞ্জনা দেবী বড়ো হয়েছেন খড়্গপুরে। ‌ ইংলিশে মাস্টার্স করেছেন তিনি। নীলাঞ্জনা দেবীর বাবা খড়গপুর আইআইটি প্রফেসর ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই রাস্তার অবলাদের নিজের সন্তানের মত ভালবাসতেন নীলাঞ্জনা দেবী। রাস্তাঘাটে কোনো অসুস্থ কুকুরের (Street dogs) সেবা থেকে শুরু করে তাদের খেতে দেওয়া সবই করেন তিনি। নীলাঞ্জনা দেবী ভেবেছিলেন বিয়ের পরে স্বামীকে তার এই কাজে পাশে পাবেন তবে ভাগ্য সহায় হয়নি। উল্টে নীলাঞ্জনা দেবীর স্বামী তার এই পশু প্রেমকে একেবারেই মেনে নেননি।

নীলাঞ্জনা দেবী যেহেতু গৃহবধূ তাই সংসার চালানোর জন্য স্বামীর কাছ থেকে মাসিক যে টাকা পেতেন সেখান থেকে টাকা বাঁচিয়ে রাস্তার কুকুরদের খাওয়াতেন। একদিন নীলাঞ্জনা দেবী দেখলেন একটি মা কুকুর রাস্তার ডাস্টবিন থেকে খাবার তুলে নিয়ে তার শিশুদের খাওয়াচ্ছেন। তাদের দেখে কষ্ট হয়েছিল নীলাঞ্জনা দেবীর। ততদিনে নিজেও এক পুত্র সন্তানের মা হয়েছেন নীলাঞ্জনা দেবী। সেদিন থেকেই নীলাঞ্জনা ঠিক করে নিয়েছিলেন নিজেও অভুক্ত থাকলেও পথ কুকুরদের (Street dogs) কোনদিন অভুক্ত রাখবেন না। তারপর থেকেই শুরু করলেন প্রেসার কুকারে রান্না করা। সেই রান্না নিয়ে গিয়ে সারা এলাকায় ঘুরে ঘুরে কুকুরদের খাওয়ানো। এরপর তিনি ভাড়া নিলেন টোটো তাতে মাংস ভাত চাপিয়ে নিজের এলাকার পাশাপাশি আশেপাশের এলাকাতেও কুকুরদের খাওয়াতে শুরু করলেন তিনি। কুকুরের সংখ্যা যত বাড়তে থাকল তাদের খাওয়ার খরচ তত বাড়তে থাকল। চিন্তার ভাঁজ পরল নীলাঞ্জনা দেবীর কপালে।

নীলাঞ্জনা দেবীর স্বামীর নিজস্ব একটি কারখানা রয়েছে। অর্থনৈতিক অবস্থা যথেষ্ট সচ্ছল। ‌ তবে নীলাঞ্জনা দেবীর সাথে তার স্বামীর সম্পর্ক ভালো না হওয়ায় শুরু হলো অশান্তি। নীলাঞ্জনা দেবী মানসিকভাবে ভালো থাকতে রাস্তার অবলাদের আঁকড়ে ধরেছিলেন। শুধু পশু (Street dogs) নয়, কোনো অসহায় ব্যক্তিকে হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়া থেকে শুরু করে দুঃস্থ ভবঘুরে মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়ানো সবটাই হাসি মুখে করতেন নীলাঞ্জনা দেবী। নীলাঞ্জনা দেবী যে ব্যাংকে টাকা রাখতেন সে ব্যাংকের ম্যানেজার জানতেন তার এই পশুপ্রেমের (Street dogs) ব্যাপারে। তাই তিনি নীলাঞ্জনা দেবীকে লোনের ব্যবস্থা করে দেন। এরপর সেই লোনের টাকা থেকে এই খাওয়াতে শুরু করলেন নীলাঞ্জনা দেবী। তবে টাকার লোন শোধ করা তো মুখের কথা নয়। তাই ওদের মুখে খাবার তুলে দিতে নিজের সমস্ত গয়না একে একে বিক্রি করে দিয়েছেন‌।

নীলাঞ্জনা দেবীর ছেলে আশুতোষ ক্লাস টেনে পড়ে। স্বামীর সাথে কোন সম্পর্ক নেই। স্বামীর থেকে দূরে ছেলেকে নিয়ে থাকেন নীলাঞ্জনা দেবী। বর্তমানে নিজের শারীরিক অসুস্থতা আর্থিক পরিস্থিতির কাছে হার মেনেছেন নীলাঞ্জনা দেবী। একটা সময় যে মানুষটা স্কুটিতে চেপে কল্যাণী ঘুরে সারমেয়দের খাওয়াতেন। আজ সেই মানুষটা পয়সার অভাবে পাড়ার গুটিকতক কুকুরদের (Street dogs) খাওয়াতে পারেন। এমন পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে রাস্তার অবলাদের গায়ে গরম জল ঢালা থেকে শুরু করে নানা রকম অত্যাচার করা হয় সেই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে রাস্তার পশুদের দুমুঠো খাবার তুলে দেওয়ার জন্য সর্বস্ব হারানো অবশ্যই একটি গুণের পরিচয় দিয়েছেন নীলাঞ্জনা দেবী।

আরও অন্যান্য খবর