মানবজীবনে নতুন ত্রাস HMPV ভাইরাস? কোভিডের মতোই কি ভয়াবহ হতে চলেছে এই নতুন আতঙ্ক? কি বলছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক মৈনাক গুপ্ত?

আতঙ্ক বাড়িয়ে চলেছে চীনা ভাইরাস। চোখ রাঙাচ্ছে HMPV। ফের ভাইরাসের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে গোটা বিশ্বে। বেশ কয়েকটি কেসের নজির মিলেছে ভারতেও। যদি ভারতে এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বাড়ে, তাহলে কি করোনা পরিস্থিতির মতো পরিস্থিতি তৈরি হবে? ভারতের আকাশে দুশ্চিন্তার মেঘের ঘনঘটা?

জানা গিয়েছে নতুন এই রোগ সংক্রমনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বয়স্ক ও শিশুরা। নয়া ভাইরাস প্রসঙ্গে কী বলছেন বার্ধক্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ড. মৈনাক গুপ্ত (Geriatrician Dr. Mainak Gupta)? কতটা ক্ষতি করতে পারে এই ভাইরাস? কাদের সংক্রমিত হওয়ার সম্ভবনা বেশি? সংক্রমণের পর কী কী উপসর্গের দেখা মেলে শরীরে? রোগ থেকে বাঁচার জন্য কোন কোন উপায় অবলম্বন করতে হবে? আসুন জেনে নিই…।

১) এই হিউম্যান মেটানিউমোভাইরাস আসলে কী?
ড. মৈনাক গুপ্তঃ HMPV ভাইরাস কিন্তু অনেক আগের থেকেই আছে। অনেক আগের থেকেই ছিল। প্রথম আইডেন্টিফাই হয় নেদারল্যান্ডে। এরপর ২০১৬ সালে একটা ছোট আউটব্রেক হয় ইতালি ও ইউরোপিয়ান দেশগুলোতে। তো যেটা দেখা যাচ্ছে এটা প্রথম থেকেই ছিল, এটা একটা MRNA ভাইরাস। প্রথমে যখন দেখা গিয়েছিল প্রধানত ১-৫ বছরের বাচ্চাদেরই হতো। তবে আগে যেটা দেখা যাচ্ছিল যে, সাধারণ ইনফ্লুয়েঞ্জা ইমিউনিটি সিস্টেমে সেরে যেত। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বলছে, এই ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত অ্যাডাল্ট হসপিটালাইজেসন রেট কিন্তু বেড়েছে।

২) এইচএমপিভি ভাইরাস কী নতুন কোনও ভাইরাস নাকি পুরনো কোনও ভাইরাসের মিউটেশন?
ড. মৈনাক গুপ্তঃ এই ভাইরাসের অস্তিত্ব আগে থেকেই ছিল। এই ধরনের MRNA ভাইরাসের মিউটেশন হয়েই থাকে। ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসেরও বছর বছর মিউটেশন হয়ে স্ট্রেন বদলায়। কোভিডের ক্ষেত্রেও তাই। ঠিক তেমনভাবেই এই ভাইরাসের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা ঠিক সেই রকমই।

মানবজীবনে নতুন ত্রাস HMPV ভাইরাস? কোভিডের মতোই কি ভয়াবহ হতে চলেছে এই নতুন আতঙ্ক? কি বলছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক মৈনাক গুপ্ত?

৩) রোগের লক্ষণ কী কী?
ড. মৈনাক গুপ্তঃ বাইরে থেকে আলাদা করে রোগের লক্ষণ প্রকাশ পাবে না, তবে বয়স্ক, বাচ্চারা, এছাড়া যাদের শ্বাস কষ্টের সমস্যা আছে, তাঁদের শরীরে জ্বর কিংবা অন্যান্য উপসর্গ দেখা দিতে পারে। সাধারণ ইনফ্লুয়েঞ্জার যে লক্ষণ, এই ভাইরাসের লক্ষণও কিন্তু অনেকটা সেরকমই।

৪) এই ভাইরাসে সংক্রমিত হলে সরাসরি কোনও চিকিৎসা আছে কী?
ড. মৈনাক গুপ্তঃ অবশ্যই আছে। কনজারভেটিভ ম্যানেজমেন্টেই বেশিরভাগ পেশেন্ট সেরে উঠছেন। সবসময় যে হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে তার কোন মানে নেই। অনেক সময় সোশ্যাল মিডিয়া কিংবা অন্যান্য মাধ্যমে প্যানিক তৈরি হয় ঠিকই। কিন্তু যা দেখা যাচ্ছে অল ওভার ওয়ার্ল্ডের হিসেবে মর্টালিটি রেট কিন্তু সেরকম সিগনিফিকেন্ট আছে‌।

৫) করোনার মতোই কী এই ভাইরাস ক্ষতিকর মানে প্রাণহানির আশঙ্কা আছে?
ড. মৈনাক গুপ্তঃ এখনও পর্যন্ত বিশেষ ক্ষতিকারক বলে মনে করা হচ্ছে না। তবে পরবর্তীকালে যদি এই ভাইরাস স্ট্রেন বদল করে নতুন ভাবে উপস্থিত হয় আর তা মানুষের জন্য ক্ষতিকারক হয়ে ওঠে, তখন সেটা নিয়ে চিন্তা করার কারণ আছে। এখনো পর্যন্ত অল ওভার ওয়ার্ল্ডে মর্টালিটি রেট সিগনিফিকেন্ট আছে। আর কলকাতাতেও হাতেগোনা কিছু ঘটনা নজরে এসেছে। তবে এই ভাইরাস নিয়ে আগের থেকে সতর্কতা থাকা ভালো। ‌কিন্তু প্যানিক করা উচিত নয়।‌

৬) ইতিমধ্যেই কলকাতায় এই ভাইরাসে সংক্রমণের খোঁজ মিলেছে। দ্রুত হারে কী এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে?
ড. মৈনাক গুপ্তঃ ছড়িয়ে পড়তে পারে। সাধারণত কোন ইনফ্লুয়েঞ্জা কিংবা MRNA ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। সেক্ষেত্রে এই ভাইরাস যে আগামী দিনে ছড়িয়ে পড়বে না সে আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে বিষয়টা খুবই আনপ্রেডিক্টেবল। কারণ, এ ধরনের ভাইরাস স্ট্রেন বদল করে। কিন্তু সেটা এখন হবে না পরে হবে, সেটা এখন থেকেই বলা সম্ভব নয়। তবে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়লে মানুষের মধ্যে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হবে।

৭) বয়স্ক মানুষদের মধ্যে কী এই ভাইরাস সংক্রমনের আশঙ্কা বেশি?
ড. মৈনাক গুপ্তঃ যে কোনো বয়সীদের মধ্যেই এই ভাইরাসের সংক্রমণ হতে পারে। তবে দুটো এজ গ্রুপের মধ্যে এই ভাইরাস সংক্রমণের সম্ভাবনা সব থেকে বেশি। একটি হল এক থেকে পাঁচ বছর আর অপরটি ৬০+ এজ গ্রুপ। যাদের ইমিউনিটি সিস্টেম দুর্বল, যাদের ফুসফুসের ইমিউনিটি কম তাঁদের এই ভাইরাস সংক্রমণ করতে পারে। ‌

মানবজীবনে নতুন ত্রাস HMPV ভাইরাস? কোভিডের মতোই কি ভয়াবহ হতে চলেছে এই নতুন আতঙ্ক? কি বলছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক মৈনাক গুপ্ত?

৮) এই ভাইরাসের কোনও টিকা এখনও পর্যন্ত নেই। পরবর্তীকালে করোনার মতোই কী এই ভাইরাসের জন্য কোনও টিকার প্রয়োজন হতে পারে বলে আপনার মনে হয়?
ড. মৈনাক গুপ্তঃ এখনও পর্যন্ত যা সমীক্ষা বলছে, এই ভাইরাসের ভয়াবহতা ততটাও লক্ষনীয় নয়। তবে পরবর্তীতে যদি এই ভাইরাস মারাত্মক আকার ধারণ করে ভাইরাসের মারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় তাহলে তাকে প্রতিহত করার জন্য টিকাকরণের বন্দোবস্ত হতে পারে।

৯) শিশুদের ক্ষেত্রে এই ভাইরাস কতটা ক্ষতিকারক?
ড. মৈনাক গুপ্তঃ আগেই বলা হয়েছে, এক থেকে পাঁচ বছর বয়সী দের এই ভাইরাস আক্রমণ করতে পারে। তবে সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরী।

১০) এইচএমপিভি সংক্রমণ এড়াতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত?
ড. মৈনাক গুপ্তঃ এই ভাইরাস বায়ুর মাধ্যমে ছড়াতে পারে। হ্যান্ড টু হ্যান্ড কিংবা হ্যান্ড টু মাউথ ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা বেশি। তাই বদ্ধ জায়গায় থাকলে কিংবা অনেকে একসঙ্গে থাকলে এই ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। ভাইরাসের সংক্রমণ এড়াতে মাস্ক ব্যবহার করা, সোশ্যাল ডিসটেন্স মেনটেন করা, হাত ধোয়া এই বিধিগুলি মেনে চলা জরুরী।

আরও অন্যান্য খবর