কলকাতার বুকে আন্দোলনের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। কখনো কলেজ স্ট্রিট, কখনো প্রেসিডেন্সি, আবার কখনো যাদবপুর— ছাত্র রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থেকেছে এই জায়গাগুলি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন উঠলেই ছাত্রদের আন্দোলন সরব হয়েছে রাজপথে। এবারে আবারও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় খবরের শিরোনামে। তবে শুধু ছাত্র আন্দোলন নয়, গোটা ঘটনাকে ঘিরে রাজ্যের রাজনীতিও বেশ সরগরম। অভিভাবক থেকে শিক্ষক, সাধারণ মানুষ থেকে বিশিষ্টজন— সকলেই নজর রাখছেন যাদবপুরের দিকে।
এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষাক্ষেত্রে গণতন্ত্র রক্ষা, ছাত্র সংসদ নির্বাচন, এবং প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাংশ। ইতিমধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের রাস্তা মিছিল, সভা ও বিক্ষোভে উত্তাল। এবার আন্দোলনকারীরা চরম সিদ্ধান্তের পথে। তাঁদের সাফ বার্তা, সোমবার দুপুর ১টার মধ্যে আলোচনা না হলে, আরও বড় আন্দোলনের দিকে যাবে তারা। শুধু তাই নয়, প্রশাসনিক শাটডাউনের হুঁশিয়ারিও দিয়ে রেখেছেন তারা। প্রশ্ন উঠেছে, শেষ পর্যন্ত যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই দাবির কাছে নতি স্বীকার করবে কি?
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক পড়ুয়ার অভিযোগ, তাঁদের বাড়িতে পুলিশের চিঠি যাচ্ছে, যা তাঁরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না। শিক্ষাক্ষেত্রে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ নিয়ে ইতিমধ্যেই সরব হয়েছেন শিক্ষক মহলও। বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘অভয়া মঞ্চ’-সহ একাধিক মঞ্চ এই আন্দোলনে সমর্থন জানিয়েছে। তাঁদের দাবি, ছাত্রদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া সমস্ত মামলা অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে। সেই দাবিতেই নাগরিক মিছিলের আয়োজন করা হয়েছে। এই মিছিলে অংশ নিয়েছেন যাদবপুরে আহত ছাত্র ইন্দ্রানুজ রায়ের বাবা। তিনি জানিয়েছেন, শিক্ষাক্ষেত্রে গণতন্ত্রের অবমূল্যায়ন কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যাবে না। তাঁর কথায়, “বিশ্ববিদ্যালয় মুক্ত চিন্তার জায়গা, আলোচনার মাধ্যমে জট কাটানো হোক। শিক্ষাক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন।” এমনকি, রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোসের বৈঠককে স্বাগত জানিয়েছেন তিনি। তবে সেই আলোচনায় ছাত্রদেরও অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন ইন্দ্রানুজের বাবা।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলন এখন এক নতুন মোড় নিয়েছে। গত কয়েকদিন ধরে অরবিন্দ ভবনের সামনে লাগাতার ধর্নায় বসেছেন আন্দোলনকারীরা। তাঁদের বক্তব্য, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে আলোচনায় বসতেই হবে। অন্যথায় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে আরও বড়সড় অচলাবস্থা দেখা দেবে। ইতিমধ্যেই ছাত্রদের একাংশ জানিয়ে দিয়েছে, তাঁরা পরীক্ষায় বসবেন না। বিধানসভার অধ্যক্ষ বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়ও এই প্রসঙ্গে প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন। তিনি বলেন, “আমরা ছাত্র থাকাকালীন কখনও এমন পরিস্থিতি দেখিনি। আলোচনা ছাড়া এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।” অন্যদিকে, শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ব্রাত্য বসুর গাড়িতে হামলার ঘটনা নিয়ে রাজ্যজুড়ে বিতর্ক তুঙ্গে। বাম ছাত্র সংগঠনের বিরুদ্ধে আনা এই অভিযোগ ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক তরজা শুরু হয়েছে।
আরও পড়ুনঃ জন্মের আগেই ব্ল্যাকমেইল! সরকারি হাসপাতালে কাটমানি না দিলে বন্ধ ডেলিভারি, ভাইরাল ভিডিয়োতে ফাঁস চাঞ্চল্যকর দুর্নীতি
যাদবপুরের সাম্প্রতিক এই আন্দোলনের সূত্রপাত হয় শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসুর উপস্থিতিতে। ওয়েবকুপার এক অনুষ্ঠানে তিনি গেলে, বাম ছাত্র সংগঠনের একাংশ তাঁর গাড়িতে হামলা চালায় বলে অভিযোগ ওঠে। গাড়ির কাঁচ ভেঙে যায়, সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এই ঘটনার মধ্যেই ঘটে যায় আরেক অঘটন— ব্রাত্য বসুর গাড়ির ধাক্কায় আহত হন ছাত্র ইন্দ্রানুজ রায়। অভিযোগ ওঠে, তাঁকে তৎক্ষণাৎ চিকিৎসার সুযোগ দেওয়া হয়নি। এই ঘটনার পরই ছাত্র সংগঠনের বিক্ষোভ আরও তীব্র হয়। ব্রাত্য বসুর ইস্তফার দাবি তোলে ছাত্র সংগঠন। রাজ্যপালের বৈঠকের দিকেও তাকিয়ে সকলে। তবে শেষ পর্যন্ত যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আলোচনায় বসবে কি না, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।






