শৈশবের শহর ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল তাঁকে। আর ফিরতে পারেননি। অথচ তাঁর হৃদয়ে এখনও বাংলার টান অটুট। সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস—সব মিলিয়ে কলকাতা যেন তাঁর আত্মার শহর। সেই শহরেই আজও ফেরা হয়নি তসলিমা নাসরিনের। ২০০৭ সালে বিতর্কের মুখে পড়ে কলকাতা থেকে বিদায় নিতে হয় এই প্রবাসী বাঙালি লেখিকাকে। প্রায় দুই দশক কেটে গেলেও তাঁর ফেরার রাস্তা এখনও কঠিন। তসলিমা কি তবে কোনও দিন ফিরতে পারবেন প্রিয় কলকাতায়?
এই প্রশ্ন অনেকের মনেই ঘুরপাক খায়। সাহিত্যে তাঁর অবাধ বিচরণ থাকলেও, বাস্তবে তিনি যেন এক শিকড়ছেঁড়া ভাসমান চরিত্র। জন্মস্থান বাংলাদেশ ছাড়তে হয়েছিল বিতর্কিত লেখার জন্য। আশ্রয় নিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গে। কিন্তু এখানেও স্থায়ী হতে পারেননি। বিতর্ক পিছু ছাড়েনি তাঁকে। ২০০৭ সালে তাঁর লেখা ‘দ্বিখণ্ডিত’ বই ঘিরে তৈরি হয় প্রবল রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা। শেষমেশ কলকাতা থেকে বেরিয়ে যেতে বাধ্য হন তিনি। তারপর থেকে দিল্লিতেই রয়েছেন এই লেখিকা।
বিতর্কের দীর্ঘ ১৮ বছর কেটে গিয়েছে। কিন্তু এখনও তসলিমার কলকাতায় ফেরার কোনও উদ্যোগ দেখা যায়নি। অথচ লেখিকা বারবার জানিয়েছেন, তিনি ফিরে আসতে চান। বাংলায় কথা বলতে, বাংলার আলো-বাতাসে থাকতে, এখানেই সাহিত্যচর্চা করতে চান তিনি। কিন্তু প্রশাসনিক অনুমোদন নেই। রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তাঁর ফেরা কার্যত অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এই প্রসঙ্গে কোনও আলোচনা না হলেও, এবার সংসদে ফের উঠল তসলিমা ইস্যু।
সোমবার লোকসভায় বিজেপি সাংসদ শমীক ভট্টাচার্য সরব হন এই বিষয়ে। তিনি বলেন, “তসলিমা কলকাতাকে ভালবাসেন। তিনি এখানে থাকতে চান। বাংলায় সাহিত্যচর্চা করতে চান। কেন তাঁকে ফিরতে দেওয়া হবে না?” তিনি দাবি করেন, সরকার যেন উপযুক্ত নিরাপত্তা দিয়ে তসলিমাকে ফিরিয়ে আনে। তাঁর কথায়, ২০০৭ সালে বামফ্রন্ট সরকারের সময় তসলিমাকে কলকাতা ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল। সেই সময়কার পরিস্থিতির জন্য কংগ্রেস এবং বামেরা সমানভাবে দায়ী।
আরও পড়ুনঃ অভয়া মামলায় নতুন মোড়! সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে এবার শুনানি কলকাতা হাই কোর্টে
বাংলাদেশে জন্ম হলেও লেখিকার মননে, চেতনায় বরাবরই বিদ্রোহের আগুন। ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে, নারীবাদী চেতনার পক্ষে বারবার কলম ধরেছেন তিনি। তাঁর বই ‘লজ্জা’ প্রকাশের পরই বাংলাদেশে তাঁকে নিষিদ্ধ করা হয়। এরপর ভারতে এসে কলকাতায় আশ্রয় নেন। কিন্তু এখানেও বিতর্ক পিছু ছাড়েনি। ‘দ্বিখণ্ডিত’ বইয়ে কিছু মন্তব্যের জন্য একাংশের তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। রাজ্যজুড়ে বিক্ষোভ হয়, নিরাপত্তার কারণে তাঁকে কলকাতা ছাড়তে বাধ্য করা হয়। তারপর থেকে তিনি দিল্লিতে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন।
এত বছর পর কেন নতুন করে উঠল এই বিতর্ক? বিশ্লেষকদের মতে, রাজনীতির ময়দানে তসলিমার নাম ফের এক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। বিজেপি এই প্রসঙ্গ উত্থাপন করে সংখ্যালঘু appeasement-এর প্রশ্ন তুলতে চাইছে। অন্যদিকে, তৃণমূল এখনও পর্যন্ত এ বিষয়ে নীরব। তবে একাধিক সাংস্কৃতিক মহল থেকে তসলিমার ফেরার পক্ষে সুর উঠেছে। যদিও রাজ্য সরকারের তরফে কোনও প্রতিক্রিয়া মেলেনি। প্রশ্ন একটাই—তসলিমা কি সত্যিই ফিরতে পারবেন তাঁর প্রিয় কলকাতায়, নাকি এই ইস্যু শুধুই রাজনৈতিক বিতর্কের খোরাক হয়ে থাকবে?





