যে নাম শুনলেই ব্রিটিশ শাসনের দগদগে স্মৃতি ফিরে আসে, যে নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে পলাশীর যুদ্ধ, লুঠতরাজ, শোষণ আর দাসত্ব—সেই ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’-র ইতিহাস যেন ভারতবাসীর হৃদয়ে এখনও গেঁথে আছে ক্ষতচিহ্নের মতো। একসময় এই কোম্পানি ২০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ভারত শাসন করেছিল। কিন্তু জানেন কি, ইতিহাসের সেই ভয়ংকর অধ্যায় আজ এক ভারতীয়ের মালিকানায়? যে সংস্থা এক সময় ভারতকে শাসন করত, আজ তার হাল ধরেছেন এক ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্যবসায়ী!
১৬০০ সালের ৩১ ডিসেম্বর, ব্রিটিশ রাজসভার বিশেষ সনদের অধীনে জন্ম হয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির। প্রথমদিকে এটি ছিল শুধুই একটি বাণিজ্য সংস্থা, কিন্তু ধীরে ধীরে তা হয়ে ওঠে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী শাখা। ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধে জিতে বাংলা দখল করে নেওয়ার পর, ভারতের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা কোম্পানির হাতে চলে আসে। ভারতীয় উপমহাদেশজুড়ে দাপটের সঙ্গে শাসন করতে থাকে তারা। দীর্ঘ ২০০ বছর ধরে ভারত শোষণ করে তারা যে সম্পদ লুট করেছিল, তার অঙ্ক এখনও চমকে দেয় ইতিহাসবিদদের।
ইতিহাসের আশ্চর্য মোড়ে আজ সেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মালিক এক ভারতীয়! মুম্বইয়ে জন্ম নেওয়া সঞ্জীব মেহতা, যিনি বর্তমানে ব্রিটিশ নাগরিক, তিনিই আজ এই ঐতিহাসিক কোম্পানির হাল ধরেছেন। বিলাসবহুল চা, কফি, পানীয়, উপহার সামগ্রী, স্বর্ণমুদ্রা ইত্যাদি বিক্রির মাধ্যমে কোম্পানিকে পুনরায় বাণিজ্যিকভাবে সক্রিয় করেছেন তিনি। ২০০০ সালের গোড়ায় মেহতার নজরে আসে কোম্পানিটি, এবং ২০১০ সালে লন্ডনে একটি বিলাসবহুল আউটলেট খুলে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন রূপে যাত্রা শুরু করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি।
১৯৬১ সালে মুম্বইয়ের এক গুজরাটি জৈন পরিবারে জন্ম সঞ্জীবের। তাঁর দাদা ১৯২০ সালে বেলজিয়ামে হীরে ব্যবসা শুরু করেন, যার প্রভাব পড়ে মেহতার মনোজগতে। মুম্বইয়ের সিডেনহ্যাম কলেজ থেকে পড়াশোনা করে তিনি আইআইএম আহমেদাবাদ এবং পরে আমেরিকার জেমোলজিক্যাল ইনস্টিটিউটে উচ্চশিক্ষা নেন। লন্ডনে বসবাস শুরু করার পর ‘হাগি’ গরম জলের বোতলের রপ্তানি ব্যবসা দিয়ে তিনি সাফল্য পান। এরপর শুরু হয় তাঁর ঐতিহাসিক সংস্থাটির পুনরুজ্জীবনের যাত্রা।
আরও পড়ুনঃ দক্ষিণবঙ্গ-উত্তরবঙ্গে টানা বৃষ্টি, কলকাতাও ভিজবে! নিম্নচাপের জেরে দুর্যোগ বাড়ছে—কত দিন চলবে এই পরিস্থিতি?
২০১১ সালে আনন্দ মাহিন্দ্রার নেতৃত্বে মাহিন্দ্রা গ্রুপ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অংশীদার হয়। ‘ইতিহাসকে উল্টে দেওয়া’ এই প্রকল্পে মাহিন্দ্রা ও মেহতার দৃষ্টিভঙ্গি এক হয়ে যায়। এই উদ্যোগ শুধুই ব্যবসা নয়, এটি এক ঐতিহাসিক প্রতীককে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার প্রয়াস। একসময় যারা ভারতকে শাসন করেছিল, আজ তাদের নামেই এক ভারতীয় গড়ে তুলছেন একটি নতুন পরিচয়, নতুন মর্যাদা। ইতিহাস যেন ফিরছে তার মূল শিকড়ে, এইবার ভারতীয়ের হাত ধরে।






