রাজ্যের ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া (SIR) ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, তা ক্রমশই রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। একদিকে যেমন নির্বাচন কমিশনের কড়া নজরদারি, অন্যদিকে তেমনই রাজ্য সরকারের তরফে উদ্বেগ ও অভিযোগ—এই দ্বন্দ্বের আবহে বাংলার SIR প্রক্রিয়া এখন নতুন মোড়ে দাঁড়িয়ে। সাধারণ মানুষের মধ্যেও এই প্রক্রিয়া নিয়ে কৌতূহল ও আতঙ্ক—দু’টিই বাড়ছে, যার প্রভাব পড়ছে গোটা রাজ্যের রাজনৈতিক পরিবেশে।
এই পরিস্থিতিতে SIR-এর কাজ আরও কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে বাংলায় চারজন বিশেষ রোল অবজার্ভার (Special Roll Observer) নিয়োগ করেছে নির্বাচন কমিশন। কমিশনের তরফে জানানো হয়েছে, ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রতিটি ধাপ যেন নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে হয়, তা নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ। নতুন করে নিযুক্ত চার পর্যবেক্ষক হলেন বিকাশ সিং, সন্দীপ রেওয়াজি রাঠৌর, রতন বিশ্বাস এবং ডক্টর শৈলেশ। তাঁরা কলকাতায় রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দপ্তরে বসেই কাজ করবেন, তবে প্রয়োজনে রাজ্যের বিভিন্ন জেলাতেও পরিদর্শনে যেতে পারেন।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা যাচ্ছে, রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ আগরওয়ালের সঙ্গে সমন্বয় রেখেই এই চার আধিকারিক SIR সংক্রান্ত কাজকর্ম খতিয়ে দেখবেন। উল্লেখযোগ্যভাবে, এর আগেও অবসরপ্রাপ্ত আইএএস আধিকারিক সুব্রত গুপ্তকে বাংলার স্পেশাল রোল অবজার্ভার হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। এবার সেই নজরদারি আরও বিস্তৃত করতেই চারজন অতিরিক্ত পর্যবেক্ষক পাঠানো হল বলে মনে করা হচ্ছে। পাশাপাশি, মাইক্রো অবজার্ভারদের উদ্দেশ্যে কড়া বার্তাও দেওয়া হয়েছে—বুথ লেভেল অফিসার (BLO), সহকারী নির্বাচনী আধিকারিক (AERO) ও নির্বাচনী আধিকারিকদের (ERO) কাজে কোনও গাফিলতি বরদাস্ত করা হবে না।
এরই মধ্যে SIR প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে চিঠি লিখেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। চিঠিতে তিনি অভিযোগ করেন, ভোটার তালিকা সংশোধনের এই প্রক্রিয়া ভোটারদের অন্তর্ভুক্ত করার বদলে ক্রমশ জোরজবরদস্তি ও আতঙ্কের কারণ হয়ে উঠছে। তাঁর দাবি, SIR-এর জেরে রাজ্যে ব্যাপক মানসিক চাপ তৈরি হয়েছে, যার ফল মারাত্মক।
আরও পড়ুনঃ India – Bangladesh : ডোনাল্ড ট্রাম্পের পথেই কি ঢাকা? ভিসা সীমিত করে এবার ভারতের পণ্যে বাড়তি শুল্কের ইঙ্গিত!
মুখ্যমন্ত্রীর চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত উদ্বেগের কারণে এখনও পর্যন্ত ৭৭ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। পাশাপাশি ৪ জন আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন এবং অন্তত ১৭ জন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন বলেও দাবি করা হয়েছে। নামের বানানে সামান্য ভুল বা বাবা-মায়ের বয়সের সঙ্গে সন্তানের বয়সের পার্থক্য ১৮-১৯ বছর হলেই কেন মানুষকে হিয়ারিংয়ে ডেকে হয়রানি করা হচ্ছে—সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি। চিঠির শেষে মুখ্যমন্ত্রী লেখেন, “যদিও দেরি হয়ে গিয়েছে, তবু আশা করি মানুষের হয়রানি কমাতে উপযুক্ত পদক্ষেপ করা হবে।”
সব মিলিয়ে, বাংলার SIR এখন শুধুই একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়, বরং রাজনৈতিক ও মানবিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে—যার দিকে নজর রেখেছে গোটা দেশ।






