কলকাতার সরকারি হাসপাতাল মানেই সাধারণ মানুষের শেষ ভরসা। কম খরচে চিকিৎসা, অভিজ্ঞ ডাক্তার—সব মিলিয়ে হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন ভিড় করেন এই হাসপাতালগুলোতে। কিন্তু সেই ভরসার জায়গাতেই যদি বারবার উঠে আসে মৃত্যু, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে নিরাপত্তা নিয়ে।
গত কয়েক মাসে একাধিক ঘটনায় ইতিমধ্যেই বিতর্কে জড়িয়েছে শহরের বড় বড় সরকারি হাসপাতাল। কখনও পরিষেবা নিয়ে অভিযোগ, কখনও অব্যবস্থা—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা অস্বস্তি তৈরি হচ্ছিল। আর ঠিক সেই আবহেই শুক্রবার সামনে এল একদিনে জোড়া মৃত্যুর খবর, যা নতুন করে উদ্বেগ বাড়াল।
শুক্রবার সকালে SSKM Hospital-এ চাঞ্চল্য ছড়ায় এক সাফাইকর্মীর ঝুলন্ত দেহ উদ্ধারের ঘটনায়। মৃতের নাম ইমরান সর্দার (২২)। তিনি ওই হাসপাতালের গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজি বিভাগে চুক্তিভিত্তিক সাফাইকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, মেন ব্লকের উল্টোদিকে গ্যাস্ট্রো বিভাগের ওপিডির চারতলার একটি ঘর থেকে তাঁর দেহ উদ্ধার হয়। ঘরটি ভিতর থেকে বন্ধ ছিল। সকালে এক কর্মী দরজা বন্ধ দেখে সন্দেহ করেন। পরে দরজা ভেঙে ভিতরে ঢুকতেই দেখা যায় ঝুলন্ত অবস্থায় দেহটি রয়েছে। পুলিশ এসে দেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তে পাঠিয়েছে। প্রাথমিকভাবে এটিকে আত্মহত্যা বলেই মনে করা হচ্ছে। তবে ঠিক কী কারণে এই চরম সিদ্ধান্ত, তা নিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে। সহকর্মীদের জিজ্ঞাসাবাদও চলছে।
একই দিনে আরও একটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে আরজি কর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (RG Kar Medical College and Hospital)-এ। মৃতের নাম অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি তাঁর চার বছরের ছেলেকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে এসেছিলেন। শিশুটির হাত ভেঙে গিয়েছিল এবং অস্ত্রোপচারের কথা ছিল। জানা গেছে, রাত আড়াইটে নাগাদ ট্রমা কেয়ার সেন্টারের একটি লিফটে ওঠেন অরূপবাবু। হঠাৎই লিফটটি বিকল হয়ে যায় এবং নিচের বেসমেন্টে আটকে পড়ে। অভিযোগ, দীর্ঘ সময় ধরে তিনি লিফটের ভিতরেই আটকে ছিলেন। শ্বাসকষ্টে তাঁর মৃত্যু হয় বলে প্রাথমিক অনুমান। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে—এতক্ষণ ধরে একজন মানুষ লিফটে আটকে থাকলেন, অথচ কেউ সাহায্য করতে পারল না কেন? প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, ওই সময় লিফটে কোনও লিফটম্যান ছিল না, এমনকি জরুরি চাবিও ছিল না নিরাপত্তারক্ষীদের কাছে।
দুটি ঘটনাই আলাদা হলেও এক সুতোয় গাঁথা—সরকারি হাসপাতালের পরিষেবা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা। একদিকে হাসপাতালের ভেতরে কর্মীর মৃত্যু, অন্যদিকে লিফটে আটকে রোগীর আত্মীয়ের প্রাণ যাওয়া—দুটোই চরম অব্যবস্থার ইঙ্গিত দিচ্ছে। অরূপবাবুর পরিবারের দাবি, সময়মতো উদ্ধার করা গেলে হয়তো বাঁচানো যেত তাঁকে। অন্য রোগীর আত্মীয়রাও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, রাতের বেলায় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা বা প্রযুক্তিগত নজরদারি থাকে না। অন্যদিকে, SSKM-এর ঘটনাতেও প্রশ্ন উঠছে—কীভাবে একটি ঘরে দীর্ঘ সময় কেউ নজরে না পড়ে ঝুলন্ত অবস্থায় থাকলেন? হাসপাতালের মতো সংবেদনশীল জায়গায় এমন নজরদারির ঘাটতি কেন?
আরও পড়ুনঃ Calcutta High Court: অফিসার বদলি ইস্যুতে আদালতে দৌড় কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়—“প্রশাসন ব্যাহত হচ্ছে” দাবি তুলেই কি চাপ তৈরি করতে চাইছে শাসকশিবির? নাকি নিরপেক্ষ নির্বাচনের পথেই বাধা?
এই জোড়া মৃত্যুর ঘটনা আবারও প্রমাণ করল, শুধু চিকিৎসা নয়—হাসপাতালে নিরাপত্তা এবং নজরদারিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এখন দেখার, এই ঘটনার পর প্রশাসন কী পদক্ষেপ নেয়, নাকি আবারও কিছুদিন পর সবকিছু চাপা পড়ে যায়।





