রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের দ্বিতীয় দফার ভোটের আগে ফের সক্রিয় হল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। শনিবার ভোরে উত্তর ২৪ পরগনার হাবড়া এলাকায় একাধিক জায়গায় হানা দেয় কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার আধিকারিকরা। মূলত রেশন বণ্টন দুর্নীতি বা রেশন স্ক্যাম সংক্রান্ত আর্থিক লেনদেনের শিকড় খুঁজতেই এই তল্লাশি অভিযান চালানো হয় বলে জানা গেছে। ভোটের মুখে এই ধরনের তৎপরতায় স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক মহল ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।
ইডি সূত্রে জানা গেছে, এদিন সকালে বিশেষ টিম প্রথমে হানা দেয় হাবড়ার জয়গাছি বারজি রোড এলাকার বাসিন্দা ও চাল ব্যবসায়ী সমীর চন্দ্রের বাড়িতে। দীর্ঘদিন ধরে তিনি স্থানীয় চাল বাজার ও পাইকারি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। অভিযোগ, রেশন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত কিছু অসাধু চক্রের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ আর্থিক লেনদেন ও কালোবাজারির যোগ থাকতে পারে তাঁর ব্যবসায়। বাড়িতে হানা দেওয়ার সময় আধিকারিকরা তাঁকে ঘুম থেকে ডেকে তোলেন এবং শুরু হয় জিজ্ঞাসাবাদ। একই সঙ্গে তাঁর বাড়ির বিভিন্ন নথিপত্র খতিয়ে দেখা হয় এবং আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত কাগজপত্র সংগ্রহ করা হয়।
একই দিনে হাবড়ার শ্রীনগর এলাকায় আরও এক চাল ব্যবসায়ী সাগর সাহার বাড়িতেও হানা দেয় ইডি। সকাল থেকেই তাঁর বাড়ির সামনে কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদের মোতায়েন করা হয় যাতে কোনও অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি না হয়। আধিকারিকরা দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন। পাশাপাশি দক্ষিণ হাবড়ার সুভাষ রোড এলাকায় চাল ব্যবসায়ী রাজীব সাহা ও পার্থ সাহার বাড়িতেও তল্লাশি চালানো হয়। সব মিলিয়ে একাধিক ব্যবসায়ীর বাড়ি ও অফিস মিলিয়ে গোটা এলাকায় ব্যাপক অভিযান চালায় ইডি।
তল্লাশি চলাকালীন এলাকায় মোতায়েন ছিল কেন্দ্রীয় বাহিনী। প্রতিটি বাড়ির প্রবেশপথ ঘিরে রাখা হয় এবং বাইরের মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয়। ইডি আধিকারিকরা ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন নথি, লেনদেনের হিসাব এবং রেশন সংক্রান্ত কাগজপত্র খতিয়ে দেখেন। পাশাপাশি তাঁদের বয়ানও রেকর্ড করা হয়। তদন্তকারীদের মূল লক্ষ্য ছিল, চাল ও রেশনের সামগ্রী কোথা থেকে কেনা হচ্ছে, কোন দামে বাজারে বিক্রি হচ্ছে এবং এর মধ্যে কোনও অবৈধ আর্থিক লেনদেন রয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখা।
ইডি সূত্রে আরও জানা গেছে, রেশন দুর্নীতি সংক্রান্ত তদন্ত নতুন নয়। এর আগে কোভিড সময়কালে গম ও খাদ্যশস্য পাচার সংক্রান্ত একাধিক অভিযোগ সামনে আসে। সেই সময় প্রায় ১৭১ ট্রাক গম পাচারের অভিযোগ ওঠে এবং মোট ৫ হাজার টনেরও বেশি গম অবৈধভাবে সরানোর বিষয়টি তদন্তে উঠে আসে। আর্থিক পরিমাণের হিসেবে প্রায় ১৬ কোটি টাকার গম লেনদেনের তথ্যও পাওয়া যায় বলে দাবি তদন্তকারীদের। সেই ঘটনার সূত্র ধরেই ফের নতুন করে তদন্ত শুরু করেছে ইডি।
এই মামলায় নাম জড়িয়েছে একাধিক রপ্তানিকারক ও মধ্যস্বত্বভোগীর। অভিযোগ, এফসিআই থেকে আসা খাদ্যশস্য বাজারে সরিয়ে দিয়ে বড় অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, সেই টাকা পরে বিভিন্ন উপায়ে সাদা করার চেষ্টা হয়েছে বলেও সন্দেহ তদন্তকারীদের। এই পুরো চক্রে রাজনৈতিক যোগও রয়েছে বলে অতীতে একাধিকবার অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে প্রাক্তন খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের নামও বিভিন্ন সময়ে এই তদন্তে উঠে এসেছে। যদিও তিনি বর্তমানে জামিনে মুক্ত।
আরও পড়ুনঃ “আমি চাই বিজেপি জিতে সরকার গঠন করুক…সাগরদীঘিতে আমি হারছি” তৃণমূল প্রার্থী বায়রন বিশ্বাসের বি*স্ফোরক মন্তব্যে তোলপাড় রাজনীতি! প্রথম দফার ভোটেই কি স্পষ্ট হয়ে গেল শাসকদলের বিপর্যয়ের ইঙ্গিত?
সব মিলিয়ে হাবড়া এলাকায় এদিনের ইডি অভিযানকে কেন্দ্র করে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি হয়েছে। মোট ১৭টি জায়গায় একযোগে তল্লাশি চালানো হয় বলে জানা গেছে। ভোটের ঠিক আগে এই ধরনের অভিযান রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। তদন্ত এখনও চলছে এবং আরও তথ্য সামনে আসতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে ইডি আধিকারিকরা।





