ভোট গ্রহণ পর্ব শেষ হতেই এবার নজর ভোট গণনার দিকে। আর সেই গণনাকে ঘিরে কোনওরকম গাফিলতি বরদাস্ত করবে না নির্বাচন কমিশন (Election Commission of India)। নির্বাচন প্রক্রিয়ার শুরু থেকেই শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে কমিশন কড়া অবস্থান নিয়েছে। এসআইআর সংশোধন থেকে ভোটগ্রহণের বিভিন্ন ধাপ, প্রতিটি জায়গায় দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মীদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হয়েছে। এবার গণনার আগে ফের স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে দায়িত্বে অবহেলা বা ভুল ধরা পড়লে শুধু বিভাগীয় শাস্তি নয়, চাকরি হারানোর মতো কঠোর পরিণতিও হতে পারে। এই বার্তাকে ঘিরে প্রশাসনিক মহলে ইতিমধ্যেই বাড়ছে চাপ ও সতর্কতা।
নির্বাচন কমিশনের এই কড়া অবস্থানের পেছনে রয়েছে সাম্প্রতিক কিছু অভিজ্ঞতা। বিশেষ করে ফলতাতে ভোটগ্রহণের সময় দায়িত্বে থাকা প্রিসাইডিং ও পোলিং অফিসারদের বিরুদ্ধে নানা ত্রুটির অভিযোগ উঠে আসে। কমিশনের নজরে আসে দায়িত্ব পালনে একাধিক গাফিলতি, যা ভোট প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছিল। সেই ঘটনার পর থেকেই কমিশন বুঝিয়ে দিয়েছে, নির্বাচন সংক্রান্ত কাজে সামান্য অবহেলাও আর হালকাভাবে দেখা হবে না। তাই ভোট গণনার দিন যাতে একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি না হয়, তার জন্য আগেভাগেই কড়া প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
গণনাকেন্দ্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে এবার প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। গণনাকেন্দ্রে প্রবেশের সময় পরিচয় যাচাইয়ের জন্য আধুনিক ভেরিফিকেশন ব্যবস্থা চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি প্রতিটি কাউন্টিং টেবিলে অন্তত একজন সুপারভাইজার বা অ্যাসিস্ট্যান্ট থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কমিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে মূলত কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীদেরই রাখা হতে পারে। বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাঁদের নিয়োগ করা হবে এবং নিরাপত্তার স্বার্থে ব্যক্তিগত তথ্য, বিশেষ করে ফোন নম্বর, গোপন রাখা হবে। কমিশনের মতে, এতে কাজের স্বচ্ছতা যেমন বাড়বে, তেমনই বাইরের প্রভাবের সম্ভাবনাও কমবে।
তবে এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কও তৈরি হয়েছে। তৃনমূল কংগ্রেস আপত্তি জানিয়ে প্রশ্ন তোলে, কেন শুধুমাত্র কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীদেরই কাউন্টিং সুপারভাইজার হিসেবে নিয়োগ করা হবে। এই ইস্যুতে তারা প্রথমে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়, কিন্তু সেখান থেকে বিশেষ স্বস্তি মেলেনি। পরে বিষয়টি যায় সুপ্রিম কোর্টে-এ। আদালতে শুনানির সময় বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী (Joymalya Bagchi) স্পষ্ট জানান, নিয়ম অনুযায়ী কাউন্টিং সুপারভাইজার ও অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কেন্দ্রীয় বা রাজ্য, দুই ধরনের সরকারি কর্মীই থাকতে পারেন। ফলে কমিশন যদি কেন্দ্রীয় কর্মীদের অগ্রাধিকার দেয়, তাতে নিয়মভঙ্গের প্রশ্ন ওঠে না।
আরও পড়ুন: গণনার আগেই সাদা থান পাঠিয়ে বার্তা, বিরোধীদের চুপ করাতেই কি তৃণমূলের নতুন কৌশল বসিরহাটে?
শুনানিতে তৃণমূলের পক্ষে সওয়াল করেন কপিল সিব্বল (Kapil Sibal)। তিনি কমিশনের এই অবস্থানের বিরোধিতা করলেও আদালত কমিশনের সিদ্ধান্তের আইনি ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি। যদিও তৃণমূল দাবি করেছে, তাদের আবেদন সরাসরি খারিজ হয়নি। এই পরিস্থিতিতে ভোট গণনার দিন যাতে কোনও বিতর্ক, বিশৃঙ্খলা বা অভিযোগ না ওঠে, সেদিকেই এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে নির্বাচন কমিশন। প্রশাসনিক কড়াকড়ি, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কঠোর নজরদারির মাধ্যমে কমিশনের লক্ষ্য একটাই, স্বচ্ছ, নির্ভুল এবং বিতর্কমুক্ত ফলাফল প্রকাশ করা।





