পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পালাবদলের পর সামনে আসছে একের পর এক পুরনো অভিযোগ ও চাপা ক্ষোভ। এবার সরব হলেন প্রয়াত অভিনেতা ও প্রাক্তন সাংসদ তাপস পালের স্ত্রী নন্দিনী পাল। তিনি সরাসরি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, “তাপসের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন দিদি, ওকে ব্যবহার করে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিলেন, ক্ষমা করব না।” তাঁর দাবি, দীর্ঘদিন দল ও মানুষের জন্য কাজ করেও শেষ সময়ে একা হয়ে পড়েছিলেন তাপস পাল। নন্দিনী মনে করেন, রাজ্যে এই পরিবর্তন হওয়া দরকার ছিল। তাঁর কথায়, “এত দিন সরকার নয়, অন্যভাবে রাজ্য চালানো হচ্ছিল।” রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরই তিনি প্রকাশ্যে এই সব অভিযোগ সামনে আনেন।
নন্দিনী জানান, ১৯৯৭ সাল থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে ছিলেন তাপস পাল। তখনও তৃণমূল কংগ্রেস গঠন হয়নি বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর কথায়, সেই সময় টালিগঞ্জের খুব কম তারকাই মমতার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। নন্দিনী বলেন, “তখন বহু বার তাপসের সঙ্গে দেখা করতে আমাদের বাড়ি এসেছিলেন।” তিনি আরও জানান, ছোটবেলা থেকেই মানুষের জন্য কিছু করতে চাইতেন তাপস পাল। সেই কারণেই মমতার অনুরোধে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেন। নন্দিনীর ভাষায়, “তাপস ধান্ধাবাজ মানুষ ছিল না। ওর একটাই সমস্যা ছিল, কোনও কিছু মাথা দিয়ে চালনা করত না, সবটাই অন্তর দিয়ে ভাবত। তাই মাসুল গুনতে হয়েছে।”
আরও পড়ুন: ১৫ বছরের তৃণমূল জমানার অবসানের পর ইতিহাস গড়তে চলেছে বিজেপি! মুখ্যমন্ত্রী পদে শুভেন্দুর নাম চূড়ান্ত, ব্রিগেডে শপথের আগে কি ফাঁস হলো মন্ত্রিসভার তালিকা, কার হাতে কোন মন্ত্রক?
তাঁর অভিযোগ, বামফ্রন্ট আমলে রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার পর তাপস পালের অভিনয় জীবনেও নানা বাধা তৈরি হয়েছিল। নন্দিনী বলেন, “সেই সময়ে ওর যত ছবি বেরোত হলে, তা চলতে দেওয়া হত না। অনেক সমস্যায় পড়তে হয়েছে।” তবুও সাধারণ মানুষ তাঁকে ভোট দিয়ে সাংসদ করেছিলেন বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর মতে, সাংসদ হওয়ার পরও তাপস পাল নিষ্ঠার সঙ্গে মানুষের জন্য কাজ করেছিলেন। নন্দিনী বলেন, “খুব কঠিন সময়ে ওকে মানুষ ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেন। প্রাণ দিয়ে কাজ করেছিল তাপস। কিন্তু শেষে দলের কাউকে নিজের পাশে পায়নি।” এই মন্তব্যে তিনি তাপসের শেষ রাজনৈতিক অধ্যায় নিয়ে গভীর আক্ষেপ প্রকাশ করেন।
নন্দিনীর আরও দাবি, গরুপাচার ও চিটফান্ড নিয়ে তাপস পাল প্রশ্ন তুলেছিলেন। এরপর থেকেই দূরত্ব তৈরি হয় বলে তাঁর অভিযোগ। তিনি বলেন, “ক্ষমতায় আসার পরে দিদি ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে যান। তখন তাপসের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায় ওঁর কাছে।” একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে জানান, “চিটফান্ডের কোনও টাকা আত্মসাৎ করেনি তাপস। পরিস্থিতির শিকার হয় ও।” বহুল আলোচিত চৌমুহা বিতর্ক নিয়েও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর কথায়, “চৌমুহাকাণ্ডে তাপসের মন্তব্য ওই একটাই ভুল ছিল তাপসের।” পাশাপাশি তিনি দাবি করেন, তাপসকে নিয়ে বহু ভুল তথ্য ছড়ানো হয়েছিল এবং পরিবার নিয়েও অপপ্রচার করা হয়।
রাজ্যের বর্তমান রাজনৈতিক পরিবর্তনকে স্বাগত জানিয়ে নন্দিনী কড়া ভাষায় বলেন, “এত দিন রাজ্য চালানো হচ্ছিল না, একটা ক্লাব চালানো হচ্ছিল।” আরও বলেন, “দিদি আর দল তাপসের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন।” এমনকি তাঁর বক্তব্য, “দিদি যে ভাবে রাজ্য শাসন করলেন, তার থেকে বামফ্রন্ট শাসন ভাল ছিল, এমনকি ইংরেজ শাসনও ভাল ছিল।” ৫৯ বছর বয়সে তাপস পালের মৃত্যু প্রসঙ্গ টেনে তিনি জানান, “এক বার ফোনে কথা বলতে চেয়েছিল ও। দিদি ফোন তোলেননি।” শেষে নন্দিনী বলেন, “আমি চাই দিদি অনেক বছর বেঁচে থাকুন, যাতে উপলব্ধি করতে পারেন কী কী ভুল করেছেন।” একই সঙ্গে স্পষ্ট জানান, তিনি কোনও দিনই ক্ষমা করতে পারবেন না।






