ষাটের দশকে বলিউডে একের পর এক হৃদয়ছোঁয়া গান উপহার দিয়েছিলেন মহম্মদ রফি। তাঁর কণ্ঠের আবেগ সেই সময়ের দর্শকদের গভীরভাবে নাড়া দিত। কোনও সিনেমায় যদি মন ছুঁয়ে যাওয়ার মতো গানের প্রয়োজন হতো, তাহলে নির্মাতাদের প্রথম পছন্দ ছিলেন রফি। তাঁর গলায় এমন এক অনুভূতির শক্তি ছিল, যা সাধারণ মানুষ থেকে দেশের শীর্ষ নেতাদেরও আবেগপ্রবণ করে তুলত। এমনই এক ঘটনার সাক্ষী ছিল ১৯৬৭ সালের ছবি ‘নৌনিহাল’। এই ছবির একটি গান শুনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী নিজেকে সামলাতে পারেননি। পরে সেই ছবিকেই সারা দেশে করমুক্ত ঘোষণা করা হয়। সেই ঘটনার কথা এখনও বলিউডের ইতিহাসে বিশেষভাবে মনে করা হয়।
চলচ্চিত্র নির্মাতা সাওয়ান কুমার তাক শুধু সিনেমা নিয়েই ভাবতেন না, দেশের রাজনীতির প্রতিও তাঁর আলাদা আগ্রহ ছিল। তিনি দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন। ১৯৬৪ সালের ২৭ মে নেহরুর মৃত্যুসংবাদ পৌঁছতেই গভীরভাবে ভেঙে পড়েন তিনি। তখনই তিনি সিদ্ধান্ত নেন, নেহরুর স্মৃতিকে শ্রদ্ধা জানিয়ে একটি সিনেমা তৈরি করবেন। দীর্ঘ প্রস্তুতির পর তৈরি হয় ‘নৌনিহাল’। ১৯৬৭ সালে ছবির কাজ শেষ হয়। ছবির গল্পে দেখা যায়, এক অনাথ শিশুকে স্কুলের প্রধান শিক্ষক দত্তক নেন এবং তাকে বলা হয়, দেশের প্রধানমন্ত্রীই তার আত্মীয়। এরপর সেই শিশুর জীবনে নানা আবেগঘন ঘটনা সামনে আসে। পুরো গল্পই ছিল অনুভূতি ও সম্পর্কের টানাপোড়েনে ভরা।
এই ছবির জন্য এমন একটি গানের প্রয়োজন ছিল, যা দর্শকদের হৃদয়ে সরাসরি পৌঁছে যাবে। গানের কথা লেখেন বিখ্যাত কবি কাইফি আজমি। আর সেই গান গাওয়ার জন্য বেছে নেওয়া হয় মহম্মদ রফিকে। তাঁর কণ্ঠে রেকর্ড করা হয় আবেগময় গান, “তুমহারি জুলফ কে সায়ে মে শাম কর লুঙ্গা” নয়, বরং সেই বিশেষ গান, “মেরি আওয়াজ শুনো, পেয়ার কা রাজ শুনো।” গানের কথায় ছিল গভীর ভালোবাসা, স্মৃতি আর বিচ্ছেদের যন্ত্রণা। রফির কণ্ঠে গানটি আরও বেশি আবেগপূর্ণ হয়ে ওঠে। ছবির নির্মাতারা বিশ্বাস করেছিলেন, এই গান দর্শকদের মনে আলাদা ছাপ ফেলবে। পরে সেই বিশ্বাস সত্যিও প্রমাণিত হয়।
ছবিটি মুক্তির আগে সাওয়ান কুমারকে কেউ পরামর্শ দেন, সিনেমাটিকে করমুক্ত করার চেষ্টা করা উচিত। সেই কারণেই তিনি প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করেন। ইন্দিরা গান্ধী জানান, তিনি এখনও ছবিটি দেখেননি, তাই অন্তত একটি গান শুনতে চান। এরপর সাওয়ান কুমার টেপ রেকর্ডারে রফির সেই বিখ্যাত গানটি বাজান। গান শুরু হতেই পরিবেশ একেবারে বদলে যায়। ইন্দিরা গান্ধী যেন বাবার স্মৃতিতে ফিরে যান। তিনি চুপচাপ গান শুনতে থাকেন এবং ধীরে ধীরে তাঁর চোখ ভিজে ওঠে। উপস্থিত সবাই বুঝতে পারেন, গানটি তাঁকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি নিজের কক্ষের ভিতরে চলে যান।
আরও পড়ুনঃ পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে ফিল্মি কায়দায় উধাও তৃণমূল বিধায়ক দিলীপ মণ্ডল, শেষমেশ পুরীর হোটেল থেকে আটক করল বিশেষ তদন্তকারী দল!
ঘরে উপস্থিত মানুষজন তখন ভাবতে শুরু করেন, হয়তো কোনও সমস্যা হয়েছে। কিন্তু কিছু সময় পর সাওয়ান কুমারের কাছে খবর আসে, তাঁর আবেদন মঞ্জুর করা হয়েছে। ইন্দিরা গান্ধী সিদ্ধান্ত নেন, ‘নৌনিহাল’ ছবিকে সারা দেশে করমুক্ত করা হবে। শুধু একটি গানই যে এত বড় প্রভাব ফেলতে পারে, এই ঘটনা তার অন্যতম উদাহরণ হয়ে রয়েছে। মহম্মদ রফির কণ্ঠের আবেগ এবং ছবির গল্প মিলিয়ে সেই সময় দর্শকদের মধ্যেও ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল ‘নৌনিহাল’। আজও এই ঘটনা বলিউডের ইতিহাসে এক বিশেষ স্মৃতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়। রফির গানের শক্তি কতটা গভীর ছিল, এই ঘটনাই তার বড় প্রমাণ বলে মনে করেন অনেকে।






