‘আমরাই আসল তৃণমূল’ স্লোগানে কি বাড়ছে অন্দরের বিদ্রোহ? এবার কি মমতা-অভিষেকের পছন্দের বিরোধী দলনেতাকেই পাল্টে দেওয়ার প্রস্তুতিতে ঘাসফুলের বিধায়কদের একাংশ?

বিধানসভার নতুন সমীকরণকে ঘিরে তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে ক্রমশ বাড়ছে অস্বস্তি। নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর থেকেই দলের ভিতরে যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে, তা এবার প্রকাশ্যে চলে আসার ইঙ্গিত মিলছে। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, দীর্ঘদিন ধরে দলীয় নেতৃত্বের একক সিদ্ধান্তে পরিচালিত হওয়া সংগঠনের ভিতরে এখন নতুন এক শক্তিকেন্দ্র তৈরি হয়েছে, যারা নিজেদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার দাবি তুলছে। আর সেই কারণেই বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা নির্বাচনকে ঘিরে নতুন করে জল্পনা শুরু হয়েছে।

নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর দলের শীর্ষ নেতৃত্ব একটি বৈঠকে বিরোধী দলনেতা হিসেবে প্রবীণ নেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের নাম সামনে আনে। পাশাপাশি ডেপুটি লিডার এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পরিষদীয় পদেও কয়েকজন নেতার নাম প্রস্তাব করা হয়। কিন্তু সূত্রের খবর, এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে অধিকাংশ বিধায়কের সঙ্গে কোনওরকম আলোচনা করা হয়নি। সেই অসন্তোষই ধীরে ধীরে বড় আকার নিতে শুরু করেছে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বোঝা যায় তখনই, যখন দলের ডাকা গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বিপুল সংখ্যক নির্বাচিত বিধায়ক অনুপস্থিত থাকেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি শুধুমাত্র অনুপস্থিতি নয়, বরং নেতৃত্বের প্রতি এক ধরনের নীরব বার্তা।

দলের অভ্যন্তরীণ সূত্রে দাবি করা হচ্ছে, নির্বাচিত বিধায়কদের একটি বড় অংশ এখন চাইছেন বিধানসভায় সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গণতান্ত্রিক আলোচনার মাধ্যমে নেওয়া হোক। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে কিছু নির্দিষ্ট ব্যক্তির পরামর্শেই দল পরিচালিত হয়েছে এবং মাঠপর্যায়ের জনপ্রতিনিধিদের মতামত যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। এই পরিস্থিতিতে বিধায়কদের একাংশ মনে করছেন, বিরোধী দলনেতার মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে কেবল উপরের নির্দেশ নয়, সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের মতামতও প্রতিফলিত হওয়া উচিত। সেই কারণেই ভবিষ্যতে বিকল্প কোনও নাম সামনে আসতে পারে বলেও জোরালো জল্পনা তৈরি হয়েছে।

এই ঘটনাকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলে আরও একটি পুরনো প্রসঙ্গ নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে। এক দশক আগে বিধানসভার একটি গুরুত্বপূর্ণ কমিটির নেতৃত্ব নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, অনেকেই বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে তার তুলনা টানছেন। তখন বিরোধী শিবিরের প্রস্তাবিত নামকে পাশ কাটিয়ে অন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছিল। সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিরোধীরা গণতান্ত্রিক রীতিনীতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছিল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, আজকের পরিস্থিতি যেন সেই বিতর্কেরই উল্টো প্রতিচ্ছবি। ইতিহাসের চাকা ঘুরে এবার সেই একই ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে তৃণমূল নেতৃত্বকে।

আরও পড়ুনঃ আজ থেকে এসি-নন এসি ও দূরপাল্লার সরকারি বাসে ফ্রি রাইড পশ্চিমবঙ্গের মহিলাদের! সঙ্গে রাখতে হবে কোন কোন নথি?

সব মিলিয়ে রাজ্যের প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে বিধানসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের ভবিষ্যৎ ভূমিকা এখন অনেকটাই নির্ভর করছে দলের অভ্যন্তরীণ সমীকরণের উপর। যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়করা শীর্ষ নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন, তাহলে বিরোধী দলনেতা নির্বাচনকে ঘিরে নজিরবিহীন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে, নেতৃত্ব যদি অসন্তুষ্ট বিধায়কদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে পারে, তাহলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে আপাতত যা ইঙ্গিত মিলছে, তাতে তৃণমূলের অন্দরে ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে নতুন লড়াই শুরু হয়েছে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। সেই লড়াই শেষ পর্যন্ত দলকে কোন পথে নিয়ে যায়, এখন সেদিকেই নজর রাজ্যের রাজনৈতিক মহলের।

Khabor24x7 NewsDesk

আরও পড়ুন

আরও অন্যান্য খবর