রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদলের পর থেকেই একের পর এক দুর্নীতি, আর্থিক অনিয়ম ও নগদ অর্থ উদ্ধারের ঘটনায় বারবার শিরোনামে উঠে এসেছে তৃণমূল কংগ্রেসের নাম। বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিকে ঘিরে নানা বিতর্ক গত কয়েক দিন ধরেই রাজ্যের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ উদ্ধারের ঘটনা বারবার সামনে এসেছে এমন অভিযোগ, যেখানে স্কুল-কলেজকেই নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে বলে বিরোধীদের দাবি। কয়েক দিন আগেই কলকাতার সুরেন্দ্রনাথ কলেজের ছাত্র সংসদের কক্ষ থেকে সুটকেস ভর্তি উই-ধরা টাকা, অস্ত্র এবং গর্ভনিরোধকের প্যাকেট উদ্ধারের ঘটনায় তোলপাড় পড়েছিল রাজ্য রাজনীতিতে। সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই এ বার উত্তর ২৪ পরগনার কাঁচরাপাড়ার হার্নেট ইংরেজি মাধ্যম স্কুল থেকে উদ্ধার হল প্রায় ১ কোটি ৭৭ লক্ষ টাকা। একই সঙ্গে স্কুলের ‘সিক রুম’ থেকে উদ্ধার হয়েছে কন্ডোমের প্যাকেটও, যা নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, বুধবার গভীর রাতে কাঁচরাপাড়ার ওই বেসরকারি স্কুলে তল্লাশি অভিযান চালানো হয়। বিধায়ক সুদীপ্ত দাসের উদ্যোগে তাঁর বিধানসভা এলাকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তথ্য সংগ্রহ ও ডেটা ব্যাঙ্ক তৈরির কাজ চলছিল। সেই সূত্রেই স্কুলটিকে ঘিরে কিছু তথ্য সামনে আসে বলে দাবি করা হয়েছে। এরপর বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ তৈরি হওয়ায় রাতেই স্কুলে পৌঁছে যান বিধায়ক এবং খবর দেওয়া হয় পুলিশকে।
খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় বীজপুর থানার পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী। স্কুল চত্বরে শুরু হয় দীর্ঘ তল্লাশি অভিযান। তল্লাশির সময় স্কুলের ‘সিক রুম’-এ থাকা একটি আলমারি থেকে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ উদ্ধার হয়। টাকার পরিমাণ এতটাই বেশি ছিল যে রাতেই সেখানে নিয়ে যাওয়া হয় টাকা গোনার একাধিক মেশিন। প্রথমে দুটি মেশিন ব্যবহার করা হলেও পরে আরও একটি মেশিন আনা হয়। ভোর সাড়ে ৪টা পর্যন্ত টাকা গোনার কাজ চলে। প্রাথমিক হিসাবে উদ্ধার হওয়া অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১ কোটি ৭৭ লক্ষ টাকা।
শুধু নগদ অর্থই নয়, তল্লাশির সময় ওই আলমারি থেকেই উদ্ধার হয় একটি কন্ডোমের প্যাকেট। ফলে স্কুলের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভিতরে এমন সামগ্রী কীভাবে এল, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। ঘটনার পর থেকেই এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে।উদ্ধার হওয়া অর্থ নিয়ে বিস্ফোরক অভিযোগ করেছেন বিজেপি বিধায়ক সুদীপ্ত দাস। তাঁর দাবি, এই টাকা স্কুলের নয়। বিধায়কের অভিযোগ, এটি কিছু প্রভাবশালী তৃণমূল নেতার ‘কালো টাকা’, যা তদন্তকারী সংস্থার নজর এড়াতে স্কুলে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। তিনি আরও দাবি করেন, স্কুল পরিচালন সমিতির সঙ্গে তৃণমূল ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের যোগাযোগ ছিল। যদিও যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তাঁদের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছে স্কুল কর্তৃপক্ষ। স্কুলের প্রিন্সিপাল বিকাশচন্দ্র পাল জানিয়েছেন, উদ্ধার হওয়া অর্থ আসলে ভর্তি বাবদ জমা পড়া ফি-এর টাকা। তাঁর দাবি, এপ্রিল মাস থেকে বিভিন্ন ছাত্রছাত্রীর ভর্তি সংক্রান্ত অর্থ স্কুলে জমা ছিল এবং তা ব্যাঙ্কে জমা দেওয়ার প্রস্তুতি চলছিল। ওই অর্থ অ্যাকাউন্টস বিভাগের তত্ত্বাবধানে ছিল বলেও তিনি জানান। পাশাপাশি ‘সিক রুমে’ কন্ডোমের প্যাকেট কীভাবে এল, সে বিষয়ে তিনি কোনও ধারণা নেই বলেও দাবি করেছেন।
আরও পড়ুনঃ জ্বালানির বাজারে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত! ইথানল মিশ্রিত পেট্রোলে শুল্ক ছাড় দিল কেন্দ্র, সাধারণ মানুষের খরচ কি এবার কিছুটা কমবে?
এদিকে উদ্ধার হওয়া বিপুল নগদ অর্থের উৎস নিয়ে ইতিমধ্যেই তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। এত বড় অঙ্কের টাকা কেন ব্যাঙ্কে জমা না দিয়ে স্কুলের ভিতরে রাখা হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তের সময় স্কুলের ক্যাশিয়ার অভীক নাথ এবং অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাকাউন্ট্যান্ট সায়ন ঘোষের বক্তব্যে অসঙ্গতি পাওয়া গিয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে খবর। সেই কারণেই তাঁদের আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে বীজপুর থানার পুলিশ। তদন্তকারীদের মতে, উদ্ধার হওয়া অর্থের প্রকৃত উৎস, তার হিসাব এবং স্কুলে সেই টাকা রাখার কারণ স্পষ্ট হলেই গোটা ঘটনার আসল চিত্র সামনে আসবে। আপাতত কাঁচরাপাড়ার এই ঘটনা রাজ্যের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিকে ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে এবং রাজনৈতিক তরজাও আরও তীব্র করেছে।






