সত্যজিৎ রায় পরিচালিত আইকনিক ছবি পথের পাঁচালী মুক্তি পেয়েছিল ১৯৫৫ সালে। এটি ছিল সত্যজিৎ রায়ের প্রথম ছবি। এই ছবি করতে গিয়েই নানান সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়। শত বাধা সত্বেও তিনি হার মানেননি। পথের পাঁচালী ছবিটি বাংলা চলচ্চিত্রের একটি মাইলফলক। ছবির প্রধান দুই চরিত্র অপু ও দুর্গাকে ভুলতে পারেনি বাঙালি। পথের পাঁচালী ছবির জন্য সত্যজিৎ রায় ৫ থেকে ৭-৮ বছর বয়সী এক ছেলেকে খুঁজছিলেন। তখন সত্যজিৎ রায়ের স্ত্রী বিজয়া রায় তাদের অ্যাপার্টমেন্টের পাশের বিল্ডিং এর ছাদে একটি ছেলেকে খেলতে দেখেন। তৎক্ষণাৎ সত্যজিৎ রায়কে খবর দেন। জানা যায়, সত্যজিৎ বাবু খবর শোনা মাত্রই দেরি না করে পৌঁছে গিয়েছিল ছেলেটির বাড়িতে। সেই ছেলেটি আর কেউ নয় পথের পাঁচালীর অপু অর্থাৎ সুবীর বন্দ্যোপাধ্যায় (Subir Bandopadhyay)।
তখন সুবীর বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Subir Bandopadhyay) বয়স ছিল আট বছর। পড়াশোনা নিয়েই সব সময় ব্যস্ত থাকতেন। অভিনয় আসার তেমন কোন ইচ্ছে সুবীর বাবুর ছিল না। তখনকার সময় বাবা-মায়েরা চাইতেন না ছেলেমেয়েরা অভিনয় জগতে আসুক তাই সুবীর বাবুর অভিনয় জগতে আসার আকাঙ্ক্ষা ছিল না। সত্যজিৎ রায়ের প্রস্তাবে রাজি হননি সুবীর বাবুর পিতা। সত্যজিৎ রায় সুবীর বাবুর বাবাকে বলেছিলেন, “এটি আমার প্রথম ছবি, আমাকে বা সুবীরকে কেউ চেনে না। তবে আমি এমন একটি চলচ্চিত্র তৈরি করতে চলেছি যা বাংলা ছবির ইতিহাস বদলে দেবে। তারপর একদিন আপনার ছেলেকে ও আমাকে সমস্ত বাংলা চিনবে।” অনেক ভাবনা চিন্তার পর অবশেষে রাজি হয়েছিলেন সুবীর বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাবা।
এত বড় মাপের একটা ছবিতে দুটি প্রধান চরিত্র অপু ও দুর্গা। অপুর চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন সুবীর বন্দ্যোপাধ্যায় (Subir Bandopadhyay) ও দুর্গার চরিত্রে উমা দাশগুপ্ত, এই দুজনেরই সিনেমা সম্পর্কে তেমন কোন জ্ঞানই সে সময় ছিল না। তবে সেই ছোট্ট বাচ্চাগুলির সরলতা দিয়েই অভিনয় করিয়ে নিয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়। পথের পাঁচালীর মুক্তির পর অপু-দুর্গা চরিত্রটি তুমুল জনপ্রিয়তা পায় তবে তারপরে আর কখনও তাদের সিনেমার পর্দায় দেখা যায়নি। এরপর আর সুবীর বন্দ্যোপাধ্যায় ও উমা দাশগুপ্তকে ক্যামেরার সামনে পর্যন্ত আসতে দেখা যায়নি।তারপরে ফের অভিনয়ের প্রস্তাব এসেছিল তবে কেউই রাজি হননি।
তবে সুবীর বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Subir Bandopadhyay) গা থেকে অপু তকমা ঝেড়ে ফেলা অতটা সহজ হয়নি। স্কুল, কলেজ, চাকরির ক্ষেত্রেও অপু নামেই বিশেষ পরিচিতি ছিল তার। সুবীর বাবু বিরক্তি বোধ করলেও, তিনি বুঝতে পেরেছিলেন এই নাম তার পিছু ছাড়বে না। জানা যায় লেখাপড়া শেষ করে, সুবীর বাবু কলকাতার ইঞ্জিনিয়ারিং ফ্যাক্টরিতে কাজ নিয়েছিলেন। পরে কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে ক্লার্কের চাকরি করেছেন। ৬০ বছরের পর কর্মজীবন থেকে অবসর নেন সুবীর বাবু। বর্তমানে তার বয়স ৭৭ বছর। সুবীরবাবু থাকেন কুঁদঘাট এলাকায় ওয়ারলেস কেএমসি পার্কের কাছে। বর্তমানে তিনি একা, প্রয়াত হয়েছেন তার মা বাবা, স্ত্রীও।
তিনি ক্যামেরার সামনে আসতে না চাইলেও, বেশ কয়েকবার তিনি এসেছেন ক্যামেরার সামনে। বয়সকালে তিনি গিয়েছেন বোরাল গ্রামের সেই বাড়িতে। সে সময় ক্যামেরার সামনে স্মৃতিচারণ করতে দেখা গেছে তাকে। এখানে গেলেই তিনি হয়ে ওঠেন অপু। কিছু চরিত্র কখনও কাউকে ছাড়ে না। অপু চরিত্রটিও সুবীর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে ঠিক তেমন।





