এক মুহূর্তের জন্যও থামেনি অভিনয়! গলায় কাছা, হৃদয়ে শোক—তবু মঞ্চ কাঁপিয়ে শো স্টপার ছিলেন রবি ঘোষ!

বাংলা থিয়েটারের মঞ্চ, আলো-আঁধারির খেলা, নাটকের সংলাপে মুগ্ধ দর্শক। হাসি, কান্না, আবেগের ওঠাপড়া যেখানে একসঙ্গে ধরা দেয়, সেখানেই উঠে আসে কিছু চিরস্মরণীয় মুহূর্ত। এমনই এক মুহূর্ত তৈরি হয়েছিল ১৯৫৯ সালে মিনার্ভা থিয়েটারে। শো শুরু, চারদিক নিস্তব্ধ, মঞ্চে এক যুবকের গলা কাঁপছে, কিন্তু সংলাপে নেই একটুও ভুল। তাঁর কণ্ঠে তখন চিৎকার— “এ আল্লা, দয়া নি করিবা আল্লারে!” দর্শকের গায়ে কাঁটা। অথচ খুব কম মানুষই জানতেন, সেই যুবক রবি ঘোষের(Robi Ghosh)নিজের জীবন তখন গভীর শোকে নিমজ্জিত।

মঞ্চের আড়ালে অভিনেতাদের ব্যক্তিগত জীবন কেমন হয়? ক’জন জানেন, হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকা কান্নার গল্প? দর্শক যখন কাউকে দেখেন পর্দায় প্রাণ খুলে হাসাচ্ছেন, তখন কি বোঝা যায়, তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে হয়তো বয়ে যাচ্ছে এক কঠিন ঝড়? রবি ঘোষ ছিলেন সেই বিরল শিল্পী, যিনি নিজের কষ্ট ভুলে দর্শকের জন্য হাসি উপহার দিয়েছেন। কিন্তু ‘অঙ্গার’-এর মঞ্চে তাঁর প্রথম অভিনয়ের সময় সেই যন্ত্রণা যেন আরও বেশি প্রকট হয়ে উঠেছিল। কারণ এই নাটকের প্রথম শোয়ের মাত্র সাতদিন আগে তিনি হারিয়েছিলেন বাবাকে।

এক মুহূর্তের জন্যও থামেনি অভিনয়! গলায় কাছা, হৃদয়ে শোক—তবু মঞ্চ কাঁপিয়ে শো স্টপার ছিলেন রবি ঘোষ!

তখন বাংলা নাট্যজগতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল উৎপল দত্তের লেখা ও পরিচালিত ‘অঙ্গার’। কয়লাখনি ও শ্রমিকদের দুর্দশার কাহিনি ফুটে উঠেছিল এই নাটকে। তাপস সেনের আলোকসজ্জা, শোভা সেন, সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়, নিমাই ঘোষের মতো শক্তিশালী অভিনেতাদের উপস্থিতি— সব মিলিয়ে এটি ছিল এক ঐতিহাসিক প্রযোজনা। আর এই নাটকেই এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করছিলেন রবি ঘোষ। কিন্তু নাটকের প্রচারের মধ্যেই নেমে এল ব্যক্তিগত শোকের ছায়া। বাবার মৃত্যুর ধাক্কা সামলানোর আগেই আরও একটি শোক— ‘অঙ্গার’-এর শততম শোয়ের আগে প্রয়াত হলেন তাঁর জামাইবাবুও।

আরও পড়ুনঃ বিদেশ সফরে কুণাল ঘোষ! আদালতের প্রশ্ন— টাকার উৎস কী, চিটফান্ড মামলার টাকাই কি ভরসা?

কিন্তু থেমে থাকেননি রবি ঘোষ। কারণ থিয়েটারের অমোঘ নিয়ম— ‘শো মাস্ট গো অন’। বাবার মৃত্যুর পরেও তিনি মঞ্চে দাঁড়ালেন। পারলৌকিক কাজ সেরে মঞ্চে ফিরে এলেন গলায় কাছা বেঁধে। মঞ্চে তখন কয়লাখনির ভেতরে বিপর্যয়, শ্রমিকদের আর্তচিৎকার। আর সেই দৃশ্যেই রবি ঘোষ যখন সংলাপ বলছিলেন, তখন দর্শকের চোখ ভিজে উঠছিল। সত্য-মিথ্যার সীমানা যেন এক হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু নাটকের শেষে যখন দর্শকের উচ্ছ্বাসের ঝড় উঠল, তখন কি রবি একবারও ভাবেননি, যাঁর প্রশংসা তিনি শুনতে চেয়েছিলেন, সেই মানুষটি আর নেই?

বাংলা থিয়েটার ইতিহাসে ‘অঙ্গার’ এক স্মরণীয় অধ্যায়। কিন্তু সেই ইতিহাসের পেছনে লুকিয়ে আছে এক শোকাহত অভিনেতার লড়াইয়ের গল্প। আজও রবি ঘোষের সেই অভিনয়ের কথা বললে মানুষ স্মরণ করে সেই সংলাপ, সেই আবেগ, সেই দৃঢ়তা। কিন্তু তখন কি কেউ বুঝতে পেরেছিল, মঞ্চের আলোয় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির হৃদয়ে তখনও ঝড় বয়ে যাচ্ছে? শিল্পীর জীবন হয়তো এমনই— ব্যক্তিগত বেদনার ওপর দাঁড়িয়ে তৈরি করতে হয় চিরন্তন শিল্পের ইতিহাস।

Jui Nag

আমি জুই নাগ, পেশায় নিউজ কপি রাইটার, লেখালেখিই আমার প্যাশন। বিনোদন, পলিটিক্স ও সাম্প্রতিক খবর পাঠকদের সামনে তুলে ধরাই আমার লক্ষ্য। তথ্যভিত্তিক ও আকর্ষণীয় কনটেন্টের মাধ্যমে সঠিক সংবাদ পৌঁছে দিই।

আরও পড়ুন

RELATED Articles