‘আজি হতে শতবর্ষ পরে, কে তুমি পড়িছ বসি আমার কবিতাখানি, কৌতূহলভরে……’। সত্যিই এই লাইনগুলো কতটা প্রাসঙ্গিক আজও। সত্যিই তো কবির মৃত্যুর দেড়শো বছর পরও তিনি আজও আমাদের স্মৃতিতে অমলিন। তাঁর সৃষ্টি, তাঁর কাব্য, তাঁর ভাবধারা আজও গোটা বাঙালির স্মরণে। শুধু দেড়শো কেন, হয়ত আজ থেকে দেড়শো বছর পরও এই কথাগুলো একইরকমভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে থাকবে বাঙালির মনের চিলেকোঠায়।
আজ ২৫শে বৈশাখ। কবিগুরুর জন্মদিন। তবে শুধু এই একটা দিন তো নয়, কবি আমাদের কাছে প্রতিটা দিন, প্রতিটা মুহূর্ত স্মরণীয়। শুধু বাঙালি কেন, গোটা দেশবাসীকে তিনি নিজের ছন্দে, কবিতায়, গানে, দর্শনে আজও মুগ্ধ করে রেখেছেন। সেই রবীন্দ্রনাথের আজ ১৬০তম জন্মজয়ন্তী। আজ এই করোনা আবহেও তাই বারবার তাই তাঁর কথাই মনে আসে আর মনের মধ্যে ভেসে কিছু শব্দগুচ্ছ… “আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে। তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে…”।
১২৬৮ সালের ২৫শে বৈশাখ কলকাতার জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। গোটা বিশ্বের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ কবি তিনি। তাঁর সৃষ্টি ভারতীয় সাহিত্য-সংস্কৃতিকে আরও বেশি প্রাণোজ্জ্বল, আরও বেশি উর্বর করে তুলেছে। পরাধীন ভারতের কোনও রাজনৈতিক আন্দোলন হোক বা সামাজিক, সব ক্ষেত্রেই তাঁর অবদান যেন অতুলনীয়।
কবিগুরু একাধারে যেমন ছিলেন গল্পকার, প্রাবন্ধিক, দার্শনিক, ঔপন্যাসিক, তেমনি অন্যদিকে তিনি নাট্যকার, চিত্রশিল্পী, সঙ্গীত রচয়িতা, সুরকার। তাঁর লেখা মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার পাশাপাশি সকলকে জ্ঞানের নতুন দিকও দেখিয়েছিল।
এই করোনা মহামারির আবহেও কিন্তু কবি বারবার উঠে এসেছেন। আজ এই করোনা পরিস্থিতির জেরে হাজার হাজার মানুষ যখন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে, এমন সময়ও কবির লেখনী সকলকে ভরসা জুগিয়েছে। আজ থেকে বহু বছর আগেই কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ‘নিউ নরম্যাল’ ছকে বাঁচার কথা বলে গিয়েছিলেন। তাঁর মত ছিল, এই সূত্র না মানলে মৃত্যু মিছিল আটকানো সম্ভব নয়।
কী মনে হচ্ছে তো, লোকটা কী ভীষণ দূরদর্শী? তা তো বটেই, তবে এর মূল কারণ ছিল প্লেগ। সে যুগে প্লেগের ভয়াবহতা বড় কাছ থেকে দেখেছিলেন কবি। গ্রামকে গ্রাম উজাড় হতে দেখেছেন। চোখের সামনে একাধিক মৃত্যু দেখেছেন নিজের পরিজনদের। এই বীভৎস রূপ বড় গভীরভাবে নাড়া দেয় কবির মনে। এই কারণেই তাঁর একাধিক লেখনীতে বারবার উঠে এসেছে মহামারীর নির্মম চিত্র। তবে কবির বিশ্বাস ছিল, মৃত্যু, মহামারীর শেষে সুদিন আসবে। এসেওছিল। ঠিক যেমন এখন আমরা অপেক্ষারত এক সুন্দর, করোনামুক্ত পৃথিবীর জন্য।
করোনার এই ভয়াবহতা কোপ ফেলেছে বিশ্বভারতীতে রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী উদযাপনেও। জানা গিয়েছে, করোনার চোখ রাঙানির কারণে এবছর বন্ধ সমস্ত রকম সাংস্কৃতিক উৎসব। এও খবর মিলেছে, এই মারণ ভাইরাসের কবলে পড়েছেন বিশ্বভারতীর একাধিক কর্মী, অধ্যাপক। যার ফলে রবীন্দ্রজয়ন্তী উদযাপন সম্ভব নয়। তবে, রবীন্দ্র ভবনের কবিকক্ষে কবির ব্যবহৃত কেদারায় পুষ্পার্ঘ দিয়ে কবিকে প্রণাম জানানো হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ফের শান্তিনিকেতনের উপাসনা গৃহে স্মরণ করা হবে কবিকে। এই পরিস্থিতি যে স্বাভাবিক হবে, এই প্রার্থনাই আমাদের সকলের। তাই তো কবিও বলে গিয়েছেন, ‘সংকটের বিহ্বলতায় হও না ম্রিয়মান। মুক্ত করো ভয়, আপনা মাঝে শক্তি ধরো নিজেরে করো জয়’।





