বিশ শতকের শুরুর দিকেই বাংলার উত্থানের জন্য নিজের সবচেয়ে কার্যকরী অস্ত্র ভগিনী নিবেদিতাকে উৎসর্গ করেছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ। নিবেদিতা তাঁর বই ‘দ্য মাস্টার অ্যাজ আই সি হিম”-এ লিখেছেন যে স্বামীজি বলে গিয়েছেন কোনও দুর্বলের উপর অত্যাচার হচ্ছে দেখলে আমাদের রুখে দাঁড়ানো কর্তব্য। অত্যাচারীদের উত্তম মধ্যম দিতে হবে। অন্যায়ের প্রতিবাদ করার অধিকার সকলের রয়েছে। সাহসী হওয়া ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা, এই দুই বাণীর মধ্যে দিয়েও স্বামীজি তরুণ সমাজকে সাহসিকতার পাঠ পড়ান
উনিশ শতকে বাংলায় নবজাগরণ আনেন রামমোহন, বিদ্যাসাগরের মতো মনীষীরা। কিন্তু তা ধরে রাখার আধার কই। ইংরেজের শোষণে, অত্যাচারে বাংলার মানুষ তখন জর্জরিত। নিজের অস্তিত্ব বাঁচিয়ে রাখার জন্য লড়াই করাও তাঁর কাছে দুর্লভ। এমন সময় স্বামীজি সকলকে বোঝালেন, মন ও শরীর শক্ত না করলে স্বাধীনতা অর্জন করা অসম্ভব। সেই সময় যখন অন্যান্য ঋষি, মনীষীরা মোক্ষলাভের বাণী শোনাচ্ছেন, এমন স্বামীজি বললেন “তোমরা সবল হও, তোমাদের নিকট ইহাই বক্তব্য। গীতাপাঠ অপেক্ষা ফুটবল খেলিলে তোমার স্বর্গের আরও নিকটবর্তী হইবে”।
কিন্তু এই বহু প্রতীক্ষিত সাফল্য কীভাবে অর্জন সম্ভব হবে, এই প্রশ্ন তখন ভাবিয়ে তোলে সকলকে। এই সময় স্বামীজি বলেন, “সাফল্য লাভ করিতে হইলে প্রবল অধ্যবসায় ও ইচ্ছাশক্তি থাকা চাই। অধ্যবসায়শীল সাধক বলেন, আমি গণ্ডূষে সমুদ্র পান করিব। আমার ইচ্ছামাত্রে পর্বত চূর্ণ হইয়া যাইবে। এইরূপ তেজ, এইরূপ সঙ্কল্প আশ্রয় করিয়া খুব দৃঢ়ভাবে সাধন করো, নিশ্চয় লক্ষ্যে উপনীত হইবে”। স্বামীজির কথায়, “কেবল খাইয়া পরিয়া মূর্খের মতো জীবনযাপন অপেক্ষা মৃত্যু শ্রেয়ঃ। পরাজয়ের জীবনযাপন অপেক্ষা যুদ্ধক্ষেত্রে মরা শ্রেয়ঃ”।
গোটা দেশকে আত্মবিশ্বাসী হওয়ার মন্ত্র দিয়ে স্বামীজি বলেন, “প্রথমে আপনাকে বিশ্বাস কর। নিজের উপর বিশ্বাস রাখ, সমুদয় শক্তি তোমার ভিতরে, এটি জান ও ঐ শক্তি অভিব্যক্ত করো”।
এমন এক কোথা স্বামীজি বলেন যা দীর্ঘদিন ধরে বাংলার মানুষ ভুলতে বসেছিল। সন্ন্যাসীর কথায়, “পাপ করে কাপুরুষেরা। বীর পাপ করে না। পাপচিন্তা মনে আসতেও দিয়ো না। সাহসী হও, প্রাণের ভয়ও রাখিও না। সকলকে গিয়ে বল, ওঠ, জাগো, আর ঘুমিও না। সকল অভাব, দুঃখ ঘোচাবার শক্তি তোমার মধ্যেই রয়েছে। এ কথা বিশ্বাস করো”।
স্বামীজির আহ্বানে যেসমস্ত বীর নিজেদের প্রাণের আহূতি দিয়ে স্বাধীনতার জন্য লড়াইয়ে নামেন, তাঁদের মধ্যে অনেকেরই মৃত্যুদিন স্বামীজির জন্মদিনের দিনই। ১৯৩৩ সালে আজকের দিনেই ফাঁসি হয় প্রদোৎ ভট্টাচার্যের। এর ঠিক এক বছর পরেই আজকের দিনেই ফাঁসি মঞ্চে মৃত্যুবরণ করেন মাস্টারদা সূর্য সেন। তবে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মধ্যে সাহসিকতার যে আগুন স্বামীজি জ্বালিয়েছিলেন, তা আঁচ ছড়িয়ে পড়েছিল তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মেও।





