দুর্গাপুজো মানেই বাঙালির আনন্দের উৎসব, মিলনমেলা আর ঐতিহ্যের আবহ। বিশেষ করে গ্রামবাংলায় পুজোর আবেগ আলাদা মাত্রা পায়। প্রিয়জনকে ঘিরে, পূর্বপুরুষের স্মৃতির টানে অথবা পুরনো রীতিনীতিকে ধরে রাখতে অনেকেই প্রতি বছর নিজ গ্রামে ফিরে আসেন। তেমনই এক নাম বীরভূমের নানুরের হাটসেরান্দি গ্রামের অনুব্রত মণ্ডল। কিন্তু এবারের দুর্গোৎসবেও তাঁর বাড়ির পুজোয় আগের মতো জৌলুস ফেরেনি।
একসময় এই গ্রামে দুর্গাপুজো মানেই ছিল কেষ্টর বাড়ির পুজো। কয়েক দশক ধরে হাজার হাজার মানুষ একসাথে বসে খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন ছিল এই পুজোর বিশেষ আকর্ষণ। প্রতিবছর প্রায় ৩ থেকে ৪ হাজার মানুষকে পাত পেতে খাওয়ানো হত। সাধারণ গ্রামবাসীর কাছে এটি কেবল খাবারের উৎসব নয়, বরং কেষ্টর ‘আভিজাত্য’ ও মানুষের প্রতি তাঁর টানার প্রকাশ হিসেবে ধরা হত। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে সেই চিত্র পাল্টে গেছে।
২০২২ সালের আগস্ট মাসে গরু পাচার মামলায় সিবিআই অনুব্রত মণ্ডলকে গ্রেপ্তার করে। দীর্ঘ দু’বছর তিহাড়ে বন্দি থাকার পর ২০২৪ সালের দুর্গাপুজোর আগেই তিনি বোলপুরে ফেরেন। সেইবারও তিনি নিজের গ্রামে পুজো কাটিয়েছিলেন, তবে চোখে জল নিয়ে স্বীকার করেছিলেন—আর্থিক সংকটে পড়ে আর লোক খাওয়ানোর ব্যবস্থা করতে পারছেন না। তাঁর বক্তব্যে ধরা পড়েছিল ভাঙা ঐতিহ্যের বেদনা।
এক বছর কেটে গেছে। রাজনীতিতে ধীরে ধীরে সক্রিয় হয়েছেন কেষ্ট, এখন তিনি জেলা তৃণমূল কোর কমিটির কনভেনারও। তবে রাজনৈতিক ময়দানে ফিরলেও পুরনো অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য আর নেই। গ্রামের মানুষ ভেবেছিলেন, হয়তো এবারে আবার সেই ‘লোক খাওয়ানো’র ব্যবস্থা ফিরবে। কিন্তু অনুব্রত নিজেই জানিয়েছেন—“আমার কোনও অ্যাকাউন্টই খোলেনি, খাওয়ার আয়োজন করব কোথা থেকে?” কারণ, ইডি ও সিবিআই তাঁর সমস্ত ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করেছে।
আরও পড়ুনঃ Pahalgam Attack: পহেলগাঁওয়ের গুলিতে হারানো স্বামীর স্মৃতিতে বন্ধ ঠাকুরঘর, বিষাদের ছায়ায় স্তব্ধ দুর্গাপুজো!
যদিও আড়ম্বর নেই, তবুও পুজোর সময় গ্রাম ছেড়ে থাকার কথা ভাবতেই পারেন না অনুব্রত। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, প্রথমেই বাড়ির প্রতিমার দর্শন করেন, তারপর অন্যত্র যান। পূর্বপুরুষের পুজোর প্রতি তাঁর টান আজও অটুট। গ্রামবাসীর কাছে তাই কেষ্টর উপস্থিতি একপ্রকার ভরসা। তবে মানুষ আজও আশা করেন, হয়তো কোনও এক বছর আবার সেই পুরনো দিন ফিরে আসবে, যখন কেষ্টর বাড়ির পুজো মানেই হাজারো মানুষের মিলনমেলা।





