করোনা থেকে সেরে উঠেছেন প্রায় একমাস হয়ে গিয়েছে, কিন্তু তবুও সেই করোনা ওয়ার্ডেই করোনা রোগীদের মধ্যেই দিন কাটাচ্ছেন এক বৃদ্ধা, নাম পূরবী মুখোপাধ্যায়। জানা যায়, গত ৯ই এপ্রিল করোনা নিয়ে এম আর বাঙ্গুর হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি। তাঁকে ভর্তি করে দিয়ে যান তাঁর মেয়ে সোমা। কিন্তু তাঁকে আর কেউ ফেরাতে আসে নি।
হাসপাতালে কর্তৃপক্ষের দাবী, গত ২০শে এপ্রিল করোনা মুক্ত হয়ে যাওয়ায় তাঁকে ছেড়ে দিতে চেয়েছিলেন তারা। কিন্তু তাঁর বাড়ির কেউ, তাঁর মেয়ে তাঁকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে রাজী হন নি। এই কারণে এখনও হাসপাতালেই দিন কাটছে তাঁর।
গত চার বছর ধরে বেহালার একটি বৃদ্ধাশ্রমে থাকতেন পূরবী। তাঁকে সমস্ত রকম ভাবে সাহায্য করতেন বোনপো প্রবীর মুখোপাধ্যায়। কিন্তু করোনামুক্ত হওয়ার পর মাকে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে রাজী হননি তাঁর মেয়ে সোমা। মায়ের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক মোটেও ভাল নয় বলে জানিয়েছেন সোমা।
এদিকে, যে বৃদ্ধাশ্রমে পূরবী থাকতেন, তাদের বক্তব্য, হাসপাতাল থেকে আগে পূরবীকে বাড়িতে যেতে হবে। তারপর বৃদ্ধাশ্রমে আসতে পারেন তিনি। কিন্তু সোমা তাঁকে বাড়িতে নিয়ে যেতে নারাজ। তাঁর কথায়, “ছোট থেকে মা আমাদের উপর অনেক অত্যাচার করেছেন। ফাঁসিতে চড়তে রাজি, কিন্ত ওঁকে বাড়িতে আনব না”। সোমার দুই ভাইও মা-কে বাড়িতে নিয়ে যাওয়া তো দূরের কথা, মা-র কোনও খোঁজখবরন পর্যন্ত নেননি।
অন্যদিকে যে বোনপো পূরবীকে আর্থিক সাহায্য করতেন, তিনিও তাঁকে বাড়ি নুয়ে যেতে নারাজ। তাঁর কথায়, “আমার নিজের বয়স ষাটের উপরে। বাড়িতে তেমন জায়গাও নেই। মাসির সব খরচই আমি দিই। বাকিদেরও তো একটু দায়িত্ব নিতে হবে”।
এমন টানাপড়েনের মধ্যে বাঙ্গুর হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডেই থাকছেন পূরবীদেবী। এক সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যম রাজ্যের স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যকে এই বিষয়ে বিস্তারিত জানান। তিনি বলেন, “অনেক পরিবারই আছে, প্রিয় জন সুস্থ হওয়ার পরেও তাঁকে বাড়ি নিয়ে যেতে চায় না। দায়িত্ব নিতে হয় আমাদেরই। এই বৃদ্ধার দায়িত্বও আপাতত আমরা নিয়েছি।“
তবে করোনা-মুক্ত হওয়ার পরেও হাসপাতালে কোভিড রোগীদের সঙ্গে ওই ওয়ার্ডে থাকাটা পূরবীর জন্য শারীরিক এবং মানসিক, দু’দিক থেকেই ক্ষতিকর বলে জানচ্ছেন চিকিৎসকরা। বেশি দিন করোনা ওয়ার্ডে থাকলে দ্বিতীয় কোনও সংক্রমণের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না বলে জানিয়েছেন আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের চিকিৎসক অনির্বাণ দলুই। তাছাড়া , করোনার এই দ্বিতীয় ঢেউয়ে গোটা রাজ্য বিপর্যস্ত। হাসপাতালে বেড পাওয়া যাচ্ছে না। এই অবস্থায় একজন সেরে ওঠা রোগী যদি একটা করোনা বেড আটকে রাখেন, আর তাঁর জন্য যদি অন্য এক ক্রিটিক্যাল রোগী বেড না পান, এর থেকে খারাপ কিছু হবে না বলে মনে করেন ওই চিকিৎসক।
এই বিষয়ে এমআরবাঙুর হাসপাতালের সুপার চিকিৎসক শিশির নস্কর জানান, “আমরা ওঁকে তো রাস্তায় ফেলে দিতে পারি না। পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। আপাতত আমরাই ওঁর খেয়াল রাখছি”। এখ করোনা ওয়ার্ডেই হাসপাতালের বেডে শুয়ে পূরবীদেবী নিজের মুক্তির আশায় দিন গুনছেন।





