কালীপুজো মানেই আনন্দ, আতশবাজি আর শহরের রাত ভরা উৎসব। কিন্তু হাওড়া ও হুগলির কালীপুজো এবারে অন্যরকম অভিজ্ঞতা হিসেবে ধরা দিয়েছে স্থানীয়দের কাছে। রাতের অন্ধকারে বাজি আর ডিজেবির তাণ্ডব যেন আনন্দকে ছাপিয়ে দিয়ে তৈরি করেছে আতঙ্ক। সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে বৃদ্ধ-বাচ্চা, রীতিমতো বিপদে পড়েছে। ধোঁয়া আর বিকট শব্দে পুরো শহর ভরে গেছে অসহনীয় দূষণে।
শরীর ও প্রাণির জন্য ক্ষতিকর এই দূষণ শুরু হয়েছিল সোমবার সন্ধ্যা থেকেই। শ্রীরামপুর, রিষড়া, কোন্নগর, উত্তরপাড়া, বৈদ্যবাটি, ভদ্রেশ্বর, চন্দননগর ও চুঁচুড়ায় চলেছিল দেদার বাজি ফাটানোর প্রতিযোগিতা। সরকারি বিধি-নিষেধ ও আদালতের নির্দেশ উপেক্ষা করে রাতভর বাজি ফাটানো হয়েছে। স্থানীয় পরিবেশকর্মীরা অভিযোগ করেছেন, পুলিশ প্রশাসন কার্যত নিষ্ক্রিয় ছিল। গ্রাম ও শহরের সব এলাকা থেকে জানা যায়, কুকুর, পাখি ও মানুষও শব্দ ও বায়ুদূষণের শিকার হয়েছে।
পরিবেশকর্মীরা যন্ত্রের মাধ্যমে পরিমাপ করেছেন বাতাসের দূষণের মাত্রা। কোন্নগর, রিষড়া, উত্তরপাড়া, শ্রীরামপুর ও শহরের বিভিন্ন অঞ্চলে PM 2.5 পরিমাণে প্রতি ঘনমিটারে ৪০০ মাইক্রোগ্রাম দেখা গেছে, যা স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে অনেক গুণ বেশি। জয়ন্ত পাঁজা বলেন, “কালীপুজোর রাতে বাতাসে বাজির ধোঁয়া ও শব্দ দাপট দেখায়, পাখির ছানারা অসুস্থ হয়েছে। আদালতের নির্দেশ থাকলেও রাতে নিষিদ্ধ বাজি চলেছে।” বাজি ও ডিজেবিরোধী মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক গৌতম সরকার বলেন, “প্রশাসন চোখ বন্ধ করে বসে আছে। দোকান ও রাস্তার ধারে বিক্রি হয়েছে নিষিদ্ধ বাজি।”
দূষণের পর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। হাওড়ার পদ্মপুকুরে PM 2.5 ছিল ৪৬৪, বেলুড়ে ৫০০ মাইক্রোগ্রাম। AQI সূচক অনুযায়ী, শহরের বেশিরভাগ এলাকা এখন ‘খুব খারাপ’ বা ‘সিভিয়ার’ পর্যায়ে। শ্বাসকষ্ট, চোখে জ্বালা, হৃদরোগের রোগীদের জন্য এই দূষণ অত্যন্ত বিপজ্জনক। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, রাতভর ঘুম নেই, ছোট শিশুদের কান্না ও আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
পরিবেশকর্মী সুভাষ দত্ত বলেছেন, “নিয়মিত কালীপুজোতে সীমিত সময়ের জন্য বাজি পোড়ানোর অনুমতি থাকলেও, বাস্তবে তা কেউ মানছে না। পুলিশের কড়া নজরদারি ও মানুষের সচেতনতা জরুরি।” এই পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নিয়ে, বিশেষজ্ঞরা বলছেন আগামী বছর যেন কালীপুজো আরও সচেতনভাবে পালন করা হয়। উৎসব আনন্দের হলেও, পরিবেশ ও মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব এড়ানো প্রয়োজন।
আরও পড়ুনঃ Manikora Kali : চক্ষুদানের সময় দুলতে থাকে কালী মায়ের মূর্তি! জেনে নিন মানিকোড়ার এই অলৌকিক কাহিনী!
হাওড়া ও হুগলির এই কালীপুজো প্রমাণ করেছে, প্রথাগত উৎসব ও আধুনিক জীবনের মাঝে ভারসাম্য না থাকলে আনন্দও বিপদে পরিণত হতে পারে। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা, প্রাণী সংরক্ষণ ও বাতাসের মানের জন্য প্রশাসনের আরও সক্রিয় ভূমিকা জরুরি, নইলে প্রতিবারের উৎসব হয়ে উঠবে বিপজ্জনক অভিজ্ঞতা।






