শীতকাল এলেই কলকাতার বাতাসে আলাদা একটা রং লাগে। বইমেলা, আলোচনা, সভা—সব মিলিয়ে শহর যেন চিন্তার উৎসবে মেতে ওঠে। সেই ধারাবাহিকতাতেই এ বছর কলকাতার বুকে শুরু হল এক ভিন্নধর্মী আয়োজন, যেখানে শিল্প ও সাহিত্যর সঙ্গে হাত মিলিয়েছে ব্যবসা ও অর্থনীতির ভাবনা। নিউটাউনের তাজ তালকুটিরে দু’দিন ধরে চলছে বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমি লিটেরেচার ফেস্ট। শহরের বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে এই উৎসব ঘিরে আগ্রহ চোখে পড়ার মতো।
এই উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ছিলেন রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস। শনিবার প্রধান অতিথি হিসেবে মঞ্চে উঠে তিনি শুধু আনুষ্ঠানিক বক্তব্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং নিজের অভিজ্ঞতা ও জীবনবোধের নানা দিক তুলে ধরেছেন সহজ কথায়। অনুষ্ঠানের শুরুতেই ইআইআইএম কলকাতার কর্ণধার ও চেয়ারম্যান অধ্যাপক রমাপ্রদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা বই ‘গীতা ফর ওয়ার্ক অ্যান্ড লাইফ’ নিজের হাতে উদ্বোধন করেন রাজ্যপাল। বইয়ের নাম থেকেই বোঝা যায়—কর্মজীবন ও ব্যক্তিজীবনের ভারসাম্যে গীতার দর্শন কীভাবে কাজে লাগতে পারে, সেটাই মূল আলোচনার কেন্দ্রে ছিল।
তবে গম্ভীর আলোচনা শুরু হওয়ার আগেই রাজ্যপাল হালকা রসিকতায় ভরিয়ে দেন পরিবেশ। ক্যামেরা দেখলে নাকি তাঁর একটু লজ্জা লাগে—এই কথা বলেই তিনি স্মৃতিচারণ করেন এক ক্যামেরাম্যানের তোলা ছবির। সেই ছবি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে এমনভাবে তৈরি হয়েছিল যে, তাঁর মুখ নাকি অমিতাভ বচ্চন ও শাহরুখ খানের মিশ্রণের মতো দেখাচ্ছিল। হাসির রেশ কাটতেই তিনি টেনে আনেন গভীর তাত্ত্বিক প্রসঙ্গ। বিজ্ঞাপন, ব্যবসা আর মানুষের মনস্তত্ত্ব—সব মিলিয়ে তিনি বলেন, পৃথিবীর প্রথম বিজ্ঞাপনদাতা হিসেবে ধরা যেতে পারে সেই শক্তিকে, যে আদম ও ইভকে জ্ঞানবৃক্ষের ফল খেতে প্ররোচিত করেছিল। সেখান থেকেই কথার সূত্র ধরে উঠে আসে গীতা। রাজ্যপালের ব্যাখ্যায়, দেহ আসলে পোশাকের মতো বদলায়, কিন্তু আত্মা অমর—এই উপলব্ধি গীতা পাঠের মধ্য দিয়েই স্পষ্ট হয়।
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ঝুলিও খুলে ধরেন তিনি। কেরলে কর্মজীবনের সময় আদিবাসী এলাকার উন্নয়নের দায়িত্ব পাওয়ার গল্প বলেন রাজ্যপাল। সেতু নির্মাণ হলেও আদিবাসী সমাজের প্রতিনিধিত্ব না থাকায় যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তার কথাও অকপটে স্বীকার করেন। সেই ঘটনার শেষে এক আদিবাসী প্রধানের সরল মন্তব্য—আগে নদী পার হতেন, এখন সেতু দিয়ে যাবেন—তাঁর কথায় উন্নয়নের বাস্তব অর্থই যেন ধরা পড়ে। একইসঙ্গে স্মরণ করেন এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের অভিজ্ঞতা, যেখানে প্রস্তুতি ছাড়াই ভাষণ দিতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত শ্রোতাদের ঘুম পাড়িয়ে ফেলেছিলেন। এইসব গল্পের মধ্য দিয়েই রাজ্যপাল বোঝাতে চেয়েছেন, তত্ত্বের সঙ্গে বাস্তব জীবনের যোগাযোগ না থাকলে উন্নয়ন অসম্পূর্ণই থেকে যায়।
আরও পড়ুনঃ Naredra modi : ‘কোনও হিন্দু উদ্বাস্তু বাদ যাবে না’—শমীকের আশ্বাসের পর মোদীর কথায় কি অধরা রইল মতুয়াদের প্রশ্ন?
এইভাবেই বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমি লিটেরেচার ফেস্টের মঞ্চে গুরুগম্ভীর দর্শন, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আর হালকা রসিকতা মিলিয়ে এক অনন্য কথোপকথন তৈরি করলেন সিভি আনন্দ বোস—যা শীতের কলকাতায় ভাবনার খোরাক হয়ে রইল।





