দেশের বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে এমন দৃশ্য খুব কমই দেখা যায়। একদিকে শীর্ষ আদালতের গাম্ভীর্য, অন্যদিকে মুখ্যমন্ত্রীর নীরব উপস্থিতি—কালো চাদরে ঢাকা, একেবারে শেষ সারিতে বসে থাকা এক প্রশাসনিক প্রধান, মঙ্গলবার সকালে সুপ্রিম কোর্টে এমনই এক দৃশ্যের সাক্ষী থাকল দেশ। শুরুতে অনেকেই বুঝে উঠতে পারেননি, কেন একজন মুখ্যমন্ত্রী নিজে আদালতে হাজির। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হতে থাকে, এই উপস্থিতি শুধুই প্রতীকী নয়—এর মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে গভীর রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক প্রশ্ন।
শুনানির সময় এগোতেই সামনে আসেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রধান বিচারপতির এজলাসে তিনি পাঁচ মিনিট সময় চেয়ে নেন নিজের বক্তব্য রাখার জন্য। সওয়াল করতে গিয়ে তাঁর কণ্ঠে ছিল হতাশা ও ক্ষোভের মিশেল। তিনি বলেন, ন্যায়বিচার যেন আজ দরজার আড়ালে কাঁদছে, অথচ সাধারণ মানুষ তা পাচ্ছে না। নির্বাচন কমিশনকে একাধিক চিঠি লেখার পরও কোনও উত্তর না পাওয়ার অভিযোগ তোলেন তিনি। একই সঙ্গে স্পষ্ট করে দেন, তিনি কোনও দলের স্বার্থে নয়, একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবেই কথা বলতে এসেছেন।
মুখ্যমন্ত্রী প্রশ্ন তোলেন, কেন অসমে বিশেষ নিবিড় পুনর্নিরীক্ষণ (এসআইআর) না হলেও দীর্ঘ ২৪ বছর পর বাংলায় তা কার্যকর করা হচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলি থেকে হাজার হাজার মাইক্রো অবজারভার এনে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এমনকি নির্বাচন কমিশনকে কটাক্ষ করে তিনি ‘হোয়াটসঅ্যাপ কমিশন’ বলেও উল্লেখ করেন। সুপ্রিম কোর্টের আগের নির্দেশ মানা হচ্ছে না—এই অভিযোগ তুলে তিনি প্রধান বিচারপতিকে কিছু ছবি দেখানোরও চেষ্টা করেন।
এই শুনানি ঘিরে আগ্রহ ছিল চোখে পড়ার মতো। ভার্চুয়াল মাধ্যমে নির্ধারিত সংখ্যার তুলনায় অনেক বেশি মানুষ শুনানিতে যুক্ত হতে চেয়েছিলেন। যদিও মামলাটি প্রাথমিক তালিকায় পিছনের দিকে ছিল, অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে শুনানির সুযোগ পায়। সুপ্রিম কোর্ট জানায়, নির্দিষ্ট কিছু মামলা শেষ হওয়ার পরেই এই মামলার শুনানি হবে। তবুও মুখ্যমন্ত্রীর সরাসরি উপস্থিতি এবং সওয়াল আদালতের পরিবেশে আলাদা মাত্রা যোগ করে।
আরও পড়ুনঃ WB Govt: নিয়ম না নজিরভাঙা সিদ্ধান্ত! ভিনরাজ্যে পাঠানো হচ্ছে বাংলার স্বরাষ্ট্রসচিবকে, মুখোমুখি রাজ্য–কমিশন!
আবেদনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট কয়েকটি দাবি তুলেছেন। ২০২৫ সালের জুন ও অক্টোবর মাসে নির্বাচন কমিশনের জারি করা এসআইআর সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি বাতিলের আবেদন জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ২০২৫ সালের ভোটার তালিকার ভিত্তিতেই ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন করার নির্দেশ চাওয়া হয়েছে। সব সরকারি নথি গ্রহণ, মাইক্রো অবজারভার নিয়োগ বাতিল—এই সব দাবিও রয়েছে আবেদনে। সব মিলিয়ে, এই মামলার মাধ্যমে শুধু একটি রাজ্যের নির্বাচন নয়, দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিয়েই বড় প্রশ্ন তুলে দিলেন মুখ্যমন্ত্রী।





