কলকাতার হৃদয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ঐতিহ্যবাহী রাজভবন বহুদিন ধরেই যেন নিজেদের অতীত পরিচয়টাকেই বয়ে বেড়াচ্ছিল। ইতিহাসের বহু বাঁক পেরিয়ে আজও সেই ভবনকে ঘিরে ছিল প্রভাবশালী প্রশাসনের প্রতীকী ভাবমূর্তি। তবে গত কয়েক বছরে বদলের হাওয়া ধীরে ধীরে বইতে শুরু করেছিল। সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন উঠছিল—এই ভবন কি শুধু ক্ষমতার আসন থাকবে, নাকি মানুষের সত্যিকারের আশ্রয়স্থল হয়ে উঠবে?
এই প্রশ্নের জবাব খোঁজার চেষ্টায় বহুদিন ধরেই উদ্যোগী ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস। তাঁর ইচ্ছেই ছিল রাজভবনকে সাধারণ মানুষের আরও কাছাকাছি নিয়ে আসা। ২০২৩ সালের ২৭ মার্চ সেই ভাবনারই একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত তৈরি হয়, যখন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু রাজভবনের প্রতীকী চাবি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে তুলে দেন। ঐতিহাসিক সেই ছবি রাজ্যের প্রশাসনিক যাত্রায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে—যেখানে রাজভবন আর ভয়ের প্রতীক না থেকে হয়ে ওঠে মানুষের জন্য উন্মুক্ত একটি পরিসর।
এই ‘জন রাজভবন’-এর ভাবনার ভিতরেই ছিল মানুষের সমস্যা-আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া। রাজভবনের দোরগোড়া যেন শুধু আমলা বা অতিথিদের জন্য নয়, বরং রাজ্যের প্রত্যন্ত এলাকার সাধারণ নাগরিকের জন্যও খুলে যায়—এই লক্ষ্যেই বিগত তিন বছরে শুরু হয় বিভিন্ন কল্যাণমূলক কার্যক্রম। কোথাও প্রাকৃতিক বিপর্যয়, কোথাও হিংসা, আবার কোথাও ব্যক্তিগত নির্যাতনের অভিযোগ—যেখানেই বিপদ, সেখানেই সহায়তার হাত বাড়িয়ে পৌঁছে গেছিল রাজভবনের কর্তৃপক্ষ। ধীরে ধীরে ভবনটির চরিত্র বদলাতে শুরু করে মানুষের চোখে।
এই চলমান পরিবর্তনের মধ্যেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের ২৫ নভেম্বরের বিজ্ঞপ্তি যেন আরও স্পষ্ট করে দিল দেশের সামগ্রিক অবস্থান। নির্দেশিকা অনুযায়ী দেশজুড়ে সব রাজভবনের নাম রাখা হচ্ছে ‘লোক ভবন’ এবং রাজনিবাস হবে ‘লোকনিবাস’। অর্থাৎ, প্রশাসনিক ভবনগুলোর নামেই প্রতিফলিত হবে জনগণের উপস্থিতি। এই সিদ্ধান্ত সামনে আসতেই পশ্চিমবঙ্গের রাজভবনসহ এর অধীনস্থ সমস্ত ভবনও নতুন পরিচয় পেল—‘লোক ভবন’ নামে।
আরও পড়ুনঃ Bengal Politics : দলবদলুদের দৌরাত্ম্যে ক্ষুব্ধ বিজেপি! টিকিটের লোভে যোগদান নয়, এবার যোগ্যতা-তদন্তে কঠোর গেরুয়া শিবির!
রাজ্যপালের দফতরের তরফে স্পষ্ট জানানো হয়েছে—প্রচলিত ‘রাজভবন’-এর পরিবর্তে এখন পশ্চিমবঙ্গের সরকারি নাম ‘লোক ভবন’। অর্থাৎ, ব্রিটিশ আমলের সেই পুরনো পরিচয়কে ভেঙে দেওয়া হল আধুনিক ভারতের ভাবনার সঙ্গে মিল রেখে। মানুষের জন্য, মানুষের নামে—এই নতুন পরিচয়েই পথ চলা শুরু করল রাজ্যের ঐতিহাসিক ভবনটি।





