শান্তিনিকেতনের অরণ্যের বুকে গড়ে ওঠা সোনাঝুরি হাট শুধু একটি সাপ্তাহিক বাজার নয়—এটি বহু মানুষের স্বপ্ন, পরিশ্রম আর জীবিকার গল্প। রঙিন কাপড়, হাতে তৈরি গয়না, মাটির কাজ কিংবা কাঠের শিল্প—এই হাটে এলেই যেন গ্রামবাংলার শিল্প-সংস্কৃতির সঙ্গে সরাসরি পরিচয় ঘটে। কিন্তু সেই পরিচিত চিত্রের আড়ালে এখন জমছে অনিশ্চয়তার মেঘ। হাটের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে শিল্পী, ব্যবসায়ী এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে।
এই উদ্বেগের মূল কারণ জাতীয় পরিবেশ আদালতে ঝুলে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলা। মঙ্গলবার সোনাঝুরি হাট সংক্রান্ত চূড়ান্ত রায় ঘোষণার কথা থাকলেও তা পিছিয়ে আগামী ২ এপ্রিল দিন ধার্য হয়েছে। ফলে আপাতত স্পষ্ট নয়—এই হাট আগের মতোই চলবে, নাকি স্থান বদল করতে হবে, কিংবা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাবে। আদালতের সিদ্ধান্তের দিকেই এখন তাকিয়ে রয়েছে গোটা শান্তিনিকেতন।
বিতর্কের সূত্রপাত পরিবেশ দূষণের অভিযোগ ঘিরে। অভিযোগ ওঠে, হাটের কারণে বনাঞ্চলে প্লাস্টিকের ব্যবহার বেড়েছে, জঞ্জাল ও অপরিশোধিত তরল বর্জ্য ফেলা হচ্ছে, বেআইনি নির্মাণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সবুজ পরিবেশ। সপ্তাহে একাধিক দিন হাট বসায় ভিড় বাড়ছে, বাড়ছে শব্দদূষণও। এই সমস্ত অভিযোগ তুলে পরিবেশকর্মী সুভাষ দত্ত জাতীয় পরিবেশ আদালতে মামলা করেন। এরপর রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ ও বনদপ্তর আদালতে হলফনামা জমা দিয়ে বনভূমি দখল, দূষণ নিয়ন্ত্রণ ছাড়পত্র ছাড়া রিসর্ট-হোটেল গড়ে ওঠা এবং নিয়ম ভাঙার বিষয়গুলি উল্লেখ করে।
পরিসংখ্যানও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। খাতায়-কলমে যেখানে প্রায় ১,৮০০ জন ব্যবসায়ীর অনুমতি রয়েছে, বাস্তবে সেখানে চার হাজারেরও বেশি ব্যবসায়ী বসেন বলে অভিযোগ। যদিও বনদপ্তর মাঝেমধ্যে অভিযান চালায়, স্থানীয়দের দাবি—কিছুদিন পর ফের আগের মতোই বেনিয়ম শুরু হয়। অথচ এই হাটের সূচনা হয়েছিল ২০০০ সালে, স্থানীয় আদিবাসী শিল্পী ও আশ্রমকন্যা শ্যামলী খাস্তগীরের উদ্যোগে, সপ্তাহে মাত্র একদিনের জন্য। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই হাটই আজ দেশ-বিদেশের পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্র।
আরও পড়ুনঃ Bangladesh : বাংলাদেশে কি আসছে ভয়াবহ কিছু? ভারতীয় রাষ্ট্রদূতের পরিবারকে তড়িঘড়ি দেশে ফেরার নির্দেশ!
অন্যদিকে, ব্যবসায়ীদের বক্তব্য একেবারেই আলাদা। তাঁদের দাবি, সোনাঝুরি হাটকে ঘিরেই অসংখ্য পরিবারের রুজি-রুটি। হাট বন্ধ হলে বিপাকে পড়বেন তাঁরা। ব্যবসায়ী ইনসান মল্লিক ও তন্ময় মিত্রের কথায়, “নিয়ম মেনেই হাট চলে। এটিকে বন্ধ করা মানে হাজারো শিল্পীর জীবিকা কেড়ে নেওয়া।” বনদপ্তরের ডিএফও রাহুল কুমার অবশ্য জানিয়েছেন, বিষয়টি সম্পূর্ণ আইনি প্রক্রিয়াধীন। সব মিলিয়ে পরিবেশ রক্ষা বনাম জীবিকার লড়াইয়ে সোনাঝুরি হাটের ভবিষ্যৎ এখন পরিবেশ আদালতের রায়ের উপরেই নির্ভর করছে।





