মুখোশ খুলে দিয়েছিলেন এয়ার এশিয়ার চূড়ান্ত অনৈতিকতার, অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খোলায় চাকরি খোয়ালেন ‘জনপ্রিয়’ পাইলট!

যাঁরা ইউটিউব ঘাঁটাঘাঁটি করেন তাঁদের কাছে ‘ফ্লাইং বিস্ট’ নামটা যথেষ্ট পরিচিত। আমরা যদি এখন তাঁর প্রধান প্রফেশন বলি আপনারা হয়তো অনেকেই তাকে চিনতে পারবেন না। কিন্তু যখনই বলব তাঁর নাম ‘ফ্লাইং বিস্ট’ অমনি আপনি বলে উঠবেন আরে ইনি ইউটিউব ভ্লগার না? হ্যাঁ ঠিকই ধরেছেন ‘ফ্লাইং বিস্ট’ অর্থাৎ পাইলট গৌরব তানেজার কথাই বলা হচ্ছে এখানে। যারা ওঁনার ইউটিউব চ্যানেল নিয়মিত ফলো করেন তাঁরা নিশ্চয়ই জানেন যে গতকাল উনি ঠিক কী বলেছেন নিজের সাম্প্রতিক ইউটিউব ভিডিওতে।

গৌরব এয়ার এশিয়ার একজন পাইলট ছিলেন। ছিলেন কথাটা এই কারণেই প্রযোজ্য হচ্ছে কারণ এয়ার এশিয়া তাঁকে অন্যায় ভাবে বরখাস্ত করেছে বলে অভিযোগ আর এই নিয়েই তিনি তাঁর সাম্প্রতিক ভিডিওটি আপলোড করেছেন ইউটিউবে। গৌরবের অভিযোগের ভিত্তিতে এয়ার এশিয়ার বিরুদ্ধে তদন্তও শুরু করেছে ডিজিসিএ বা সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ। কিন্তু গৌরব নিজেই সন্দিহান যে এয়ার এশিয়ার মত একটা বড় প্রতিষ্ঠান তাঁর মতো একজন নগণ্য ব্যক্তিকে আইনি পথে বা অন্য যে কোনও পথেই হারিয়ে দিতে সক্ষম। তাঁর প্রশ্ন তাহলে কি কোনও বড় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনও সাধারণ ব্যক্তি কোনদিনও প্রতিবাদের আওয়াজ তুলতে পারবে না?

https://twitter.com/flyingbeast320/status/1274197466531815424?s=20

এই ঘটনার পিছনের আসল কারণটা কি? কি নিয়ে ঝামেলার সূত্রপাত গৌরব ও সংস্থার মধ্যে? ঘটনার সূত্রপাত হয় ২-৩ মাস আগে। গৌরব জানিয়েছেন যে গত বছর মে মাসে তিনি এয়ার এশিয়ার পাইলট হিসেবে যোগ দেন। তার আগে প্রায় এক দশক ধরে তিনি পাইলট পদে নিযুক্ত ছিলেন বিভিন্ন বিমান সংস্থায়। তিনি পাইলট হিসেবে এয়ার এশিয়ায় যোগ দেওয়ার কিছুদিন পরেই ইউটিউব চ্যানেলে একটি ভিডিও আপলোড করেন সেখানে তিনি অভিযোগ তোলেন যে এয়ার এশিয়া যাত্রী সুরক্ষার দিকে নজর না রেখে কিভাবে বিমানের জ্বালানি বাঁচানো যায় তার চিন্তাই করছে।

তিনি জানিয়েছেন যে এয়ার এশিয়া থেকে পাইলটদের কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে ৯৮ শতাংশ ক্ষেত্রে যখন বিমান ল্যান্ডিং করানো হয় তখন যেন পাইলটরা ‘ফ্ল্যাপ ৩’ মোড ব্যবহার করে ল্যান্ডিং করেন। এই মোড ব্যবহার করা মানে জ্বালানি অনেকটাই বাঁচানো যাবে।

এই ফ্ল্যাপ হল বিমানের ডানার গায়ে লাগানো একটা অংশ। যেটা ল্যান্ডিং এর সময় ওঠা-নামা করানো হয়। বিমান যখন রানওয়েতে ল্যান্ডিং করানো হয় তখন ২.৮° থেকে ৩.৫° মাপে গ্লাইড স্লোপ রেখে নামানো হয়। মোট চার ধরনের ফ্ল্যাপ মোড হয়। ফ্ল্যাপ ৪ মোডে খুব জলদি বিমান নামানোর সময় ব্যবহার করা হয় কোনো প্রাকৃতিক জিনিস বা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় মানে যেখানে রানওয়ের পাশে বাড়ি বা পাহাড় পর্বত আছে। পাইলটরা সাধারণত ফ্ল্যাপ ৪ মোডে ল্যান্ডিংকেই সবচেয়ে সুরক্ষিত মনে করেন। আর ফ্ল্যাপ ৩ মোড ব্যবহার করা হয় যেখানে রানওয়ের আশেপাশে ফাঁকা। এই মোড ব্যবহার করা মানে বিমানের ডানাকে রানওয়েতে অনেকটা হাওয়ার সাথে সামঞ্জস্য রেখে নিয়ে গিয়ে ল্যান্ডিং করানো হয় যেখানে ইঞ্জিন বন্ধ থাকে। এতে জ্বালানি অনেকটাই বেঁচে যায় বিমান কোম্পানির। কিন্তু আমাদের ভারতীয় বিমানবন্দরগুলি জনশূন্য এলাকায় অবস্থিত নয়। এর ফলে বেশিরভাগ সময় এই মোড ব্যবহার করলে দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা থেকেই যায়। এই পদ্ধতি ব্যবহারের সময় যদি কোনও রকম দুর্ঘটনা ঘটে বিমানের তবে কিন্তু বিমানের অধিকাংশ যাত্রীরই মৃত্যু ঘটতে পারে। এক্ষেত্রে এয়ার এশিয়া-র কাছে তার প্রশ্ন ছিল যে বিমানের ১৮০ জন যাত্রীর জীবন এয়ার এশিয়ার কাছে আগে নাকি জ্বালানি বাঁচানোটাই এয়ার এশিয়ার মুখ্য চিন্তা?

সাথে তিনি বলেন যে, দুর্ঘটনা ঘটলে কিন্তু দোষটা আগে পাইলটের ঘাড়ে পড়বে এবং তদন্ত শুরু হবে পাইলটের বিরুদ্ধেই এ কথা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়েছিলেন গৌরব কিন্তু এয়ার এশিয়ার বিরুদ্ধে গৌরব মুখ খুলতেই তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে পাইলট পদ থেকে। একথা রবিবার গৌরব নিজের টুইটার অ্যাকাউন্টে ট্যুইট করে জানিয়েছেন।

এরপর গৌরব অভিযোগ জানান ডিজিসিএ বা সিভিল এভিয়েশনের দফতরে। সোমবার তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে তারা বিষয়টি খতিয়ে দেখবে এবং পূর্ণাঙ্গ তদন্তের পর তারা এই বিষয়ে মন্তব্য করবে।

কিন্তু গৌরব তানেজা আশঙ্কা করছেন যে এয়ার এশিয়ার ক্ষমতা প্রচুর। দেশের বড় বড় আইনজীবীদের এক মুহূর্তে লাগিয়ে দিতে পারে তাঁর বিরুদ্ধে। সেই আইনজীবীদের পারিশ্রমিক তার এক বছরের মাইনের থেকেও বেশি। এয়ার এশিয়ার চাপে হয়তো নতিস্বীকার করতে পারে সুপ্রিমকোর্ট তখন তার পাইলট লাইসেন্সই কেড়ে নেওয়া হতে পারে। যদিও এয়ার এশিয়ার মুখপাত্র এই বিষয়ে কোন মন্তব্য করতে নারাজ। ‌তাঁরা গৌরবের অভিযোগ যথারীতি পুরোটাই অস্বীকার করেছেন।

গৌরবের এই অভিযোগই প্রমাণ করে দেয় যে প্রতিষ্ঠিত সংস্থা গুলি তাদের গ্রাহকদের সুরক্ষার থেকে নিজেদের মুনাফার কথা চিরকাল ভেবে এসেছে। সেখানে সেই সংস্থার কেউ যদি মুখ খোলে তবে তাঁর মুখ বন্ধ করার জন্য উঠেপড়ে লেগে যায় কর্তৃপক্ষ। এক্ষেত্রে এয়ার এশিয়ার অন্যায়ের শিকার হয়েছেন গৌরব। এরকম আর‌ও কত মানুষ যে প্রতিদিন সংস্থার চাপে পড়ে নতি স্বীকার করছেন তার কোন‌ও হদিশ নেই।

RELATED Articles

Leave a Comment