উত্তর ভারতের পাহাড়ি নদীগুলো বরাবরই কেবল প্রকৃতির সম্পদ নয়, কূটনীতিরও অদৃশ্য স্রোত বইয়ে নিয়ে যায়। সীমান্ত পেরিয়ে জল যেমন গড়িয়ে পড়ে, তেমনই তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে রাজনৈতিক বার্তা। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে আবারও সামনে উঠে এসেছে সেই বাস্তবতা। জম্মু-কাশ্মীরের পহেলগামে গত বছরের জঙ্গি হামলার পর থেকেই দিল্লির অবস্থান যে বদলাতে শুরু করেছে, তা স্পষ্ট হচ্ছিল ধাপে ধাপে। এবার সেই পরিবর্তনের আরও দৃশ্যমান রূপ সামনে এল ইরাবতী নদীকে ঘিরে।
২২ এপ্রিলের পহেলগাম হামলায় ২৬ জনের মৃত্যু দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। তদন্তে পাকিস্তানপুষ্ট জঙ্গি সংগঠনের নাম উঠে আসার পর নয়াদিল্লি কূটনৈতিক চাপ বাড়াতে শুরু করে। স্থগিত রাখা হয় ১৯৬০ সালের সিন্ধু জলচুক্তির বাস্তব প্রয়োগের কিছু অংশ। সেই প্রেক্ষাপটেই জম্মু-কাশ্মীর প্রশাসন জানিয়ে দিল, ইরাবতী নদীর অতিরিক্ত জল আর পাকিস্তানের দিকে বইতে দেওয়া হবে না। বর্তমানে মাধোপুর নালার মাধ্যমে যে অতিরিক্ত জল সীমান্ত পেরিয়ে যায়, নতুন ব্যবস্থায় তা আটকে দেওয়ার প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায়ে।
এই সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে রয়েছে শাহপুর কান্দি বাঁধ প্রকল্প। জম্মু-কাশ্মীরের জলসম্পদমন্ত্রী জাভেদ আহমেদ রানা জানিয়েছেন, কাশ্মীর-পাঞ্জাব সীমান্তে নির্মীয়মাণ শাহপুর কান্দি বাঁধের কাজ আগামী ৩১ মার্চের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। বাঁধ চালু হলে ইরাবতীর অতিরিক্ত জল আর পাকিস্তানে পৌঁছবে না। রানা এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বলেন, কাঠুয়া ও সাম্বা জেলা দীর্ঘদিন ধরেই খরাপ্রবণ। তাই কান্দি অঞ্চলের সেচব্যবস্থা মজবুত করতেই এই প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের বক্তব্য, স্থানীয় কৃষকদের জলসঙ্কট মেটানো এখন প্রধান লক্ষ্য।
এই প্রকল্পের অগ্রগতিতে কেন্দ্রও সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছে। সূত্রের খবর, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নিজে হস্তক্ষেপ করে দীর্ঘদিন আটকে থাকা কাজের অগ্রগতি পর্যালোচনা করেন। পহেলগাম হামলার পর চন্দ্রভাগা নদীর উপর চারটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজও দ্রুত এগোচ্ছে, যা ২০২৭-২৮ সালের মধ্যে চালু করার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, ১৯৬০ সালের চুক্তি অনুযায়ী পূর্বমুখী শতদ্রু, বিপাশা ও ইরাবতীর জল ভারতের প্রাপ্য হলেও পশ্চিমমুখী সিন্ধু, চন্দ্রভাগা ও বিতস্তায় পাকিস্তানের অধিকার রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে সেই সমঝোতার বাস্তব প্রয়োগ নিয়েই নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
আরও পড়ুনঃ Yuvasathi Scheme : মধ্যরাতের ঘণ্টা পড়তেই ‘যুবসাথী’তে ডিজিটাল ঝড়! প্রথম দিনেই ৫ লক্ষের বেশি আবেদন, চাপ সামলাতে অনলাইনেই ভরসা নবান্নের!
শাহপুর কান্দি বাঁধ প্রকল্পের ইতিহাসও কম দীর্ঘ নয়। ১৯৭৯ সালে পাঞ্জাব ও জম্মু-কাশ্মীরের মধ্যে প্রাথমিক চুক্তি হলেও প্রশাসনিক ও আর্থিক জটিলতায় কাজ বারবার থমকে যায়। ২০০১ সালে অনুমোদন, ২০০৯ সালে কেন্দ্রের আর্থিক সম্মতি—সবকিছুর পরও অগ্রগতি হয়নি। শেষ পর্যন্ত ২০১৮ সালে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা ৪৮৫.৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দ করলে নতুন করে গতি আসে। প্রকল্প সম্পূর্ণ হলে পাঞ্জাবে প্রায় ৫,০০০ হেক্টর এবং জম্মু-কাশ্মীরে ৩২,১৭৩ হেক্টর জমিতে সেচের সুবিধা মিলবে। পাশাপাশি ২০৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনাও রয়েছে। প্রায় ৮০ কিলোমিটার ইরাবতী খাল কার্যকর হলে কৃষি ও জলসংরক্ষণে বড় পরিবর্তন আসবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কূটনৈতিক টানাপোড়েনের আবহে জলসম্পদকে কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার—এই বার্তাই এখন সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ।





