ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে সুভাষচন্দ্র বসুর ভূমিকা চিরকালই বিতর্কিত আলোচনার কেন্দ্রে থেকেছে। একদিকে তাঁকে দেশমাতৃকার অকৃত্রিম সৈনিক বলে মান্য করা হয়েছে, অন্যদিকে তাঁর মহানিষ্ক্রমণকে বারবার ‘পলায়ন’ বলে আখ্যা দিয়েছে কমিউনিস্টরা। কেরলের পাঠ্যপুস্তকে সম্প্রতি সেই একই বিতর্কিত দাবি উঠে আসায় ফের নতুন করে উত্তাল হয়েছে রাজনৈতিক মহল। গবেষকদের মতে, এ কেবল কোনও ‘ঐতিহাসিক ভুল’ নয়, বরং দীর্ঘদিনের এক ইচ্ছাকৃত রাজনৈতিক চাল।
কলকাতার দুই গবেষক সৈকত নিয়োগী ও সৌম্যব্রত দাশগুপ্ত সম্প্রতি লন্ডনের আর্কাইভ থেকে ডিক্ল্যাসিফাই করা ১৯৪২ সালের একটি ফাইল প্রকাশ্যে আনেন। সেখানে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে, তৎকালীন নর্থ ফ্রন্টিয়ার প্রভিন্সে ছদ্মবেশে থাকা সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে কমিউনিস্ট নেতা হরবিন্দর সিং সোধির কথোপকথন হয়েছিল। নথি অনুযায়ী, সুভাষ রাশিয়ায় যাওয়ার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছিলেন। অথচ রাশিয়ার তরফে বারবার তাঁর প্রবেশ আটকে দেওয়া হচ্ছিল। এই সময়েই দেশীয় কমিউনিস্টরা তাঁকে ‘প্রো-ফ্যাসিস্ট’ বলে সমালোচনা করছিলেন।
ফাইলের নোট থেকে জানা যাচ্ছে, সোধির সঙ্গে আলাপচারিতায় সুভাষচন্দ্র স্পষ্ট জানান— তিনি ফ্যাসিস্ট নন। ফরওয়ার্ড ব্লকের মুখপত্রে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বহুবার কলম ধরেছিলেন তিনি, যদিও সেগুলি কমিউনিস্টরা পড়েননি বা পড়তে চাননি। সুভাষ বিশ্বাস করতেন, স্বাধীনতার সংগ্রামে সব মতাদর্শের মানুষকে একসঙ্গে লড়তে হবে। দেশের স্বাধীনতা অর্জিত হলে তখন গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে রাজনৈতিক মতবিরোধ মিটবে। তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গিকেই অবহেলা করেছে কমিউনিস্টরা— এমনটাই দাবি গবেষকদের।
নথিতে উল্লেখ আছে, রাশিয়ার বারবার অস্বীকৃতিতে সুভাষের প্রবল হতাশা তৈরি হয়েছিল। তিনি বুঝতে পারেন, সোধির সহায়তায় রাশিয়ায় পৌঁছনো সম্ভব নয়। অবশেষে ইতালিই সহায়তায় এগিয়ে আসে। মৃত সিসিলিয়ান বাসিন্দা অরল্যান্ডো মাজোটা নামে একজনের পাসপোর্টে নেতাজির ছবি বসিয়ে একটি নতুন নথি তৈরি হয়। তবে তার পরও রাশিয়া ট্রানজিট ভিসা দিতে অস্বীকার করে। গবেষক সৈকত নিয়োগীর অভিযোগ, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সোভিয়েত রাশিয়ার পাশাপাশি ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টিও নেতাজির পথে বাধা সৃষ্টি করেছিল।
আরও পড়ুনঃ West Bengal : রাজ্যের মেডিকেল কলেজে চিকিৎসক পড়ুয়াকে মানসিক নির্যা*তনের অভিযোগ, হুমকি ও কুপ্রস্তাবে তোলপাড় চিকিৎসক মহল!
শেষ পর্যন্ত ইতালির সহায়তায় সড়কপথে ইরান হয়ে কাবুল পৌঁছে নেতাজি অবশেষে বার্লিনে পৌঁছতে সক্ষম হন। এই সমগ্র যাত্রাকে গোটা বিশ্ব জানে ‘মহানিষ্ক্রমণ’ নামে। অথচ দেশের কমিউনিস্টরা একে ‘পলায়ন’ বলে কটাক্ষ করেছে— গবেষকদের বক্তব্যে উঠে এসেছে এই অভিযোগ। তাঁদের মতে, কেরলের পাঠ্যপুস্তকে নেতাজি সংক্রান্ত ভুল তথ্য কেবল একটি ‘ঐতিহাসিক ভুল’ নয়, বরং ইচ্ছাকৃত বিকৃতি। সৌম্যব্রত দাশগুপ্তের কথায়, “দেশের স্বাধীনতার জন্য সর্বস্ব বিলিয়ে লড়েছিলেন সুভাষচন্দ্র। অথচ রাজনৈতিক দ্বিচারিতার কারণে তাঁকে বারবার অপমান করা হয়েছে। আজও সেই প্রবণতা চলছেই।”





