বাংলায় কি ভবিষ্যৎ ‘বহিরাগত’ প্রশান্ত কিশোরের? মোদীর হাতে উত্থান, পতন কি মমতা সঙ্গে? জানুন বিস্তারিত

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের অন্যতম সেনাপতি, পলিটিক্যাল স্ট্র্যাটেজিস্ট বা ভোট কৌশলী প্রশান্ত কিশোর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ’র বাংলা সফরের পর‌ই সোমবার টুইটে লিখেছিলেন, ‘বিজেপি-কে সমর্থনকারী একশ্রেণির সংবাদমাধ্যম হাইপ তৈরি করলেও, বাস্তবে বাংলায় বিজেপির দুই অঙ্কের আসন পেরোন কষ্টসাধ্য হবে।’ একই সঙ্গে প্রশান্ত কিশোর উল্লেখ করেছিলেন, ‘আমার এই ট্যুইটটি সেভ করে রাখুন৷ বিজেপি এর থেকে ভাল ফল করলে আমি দায়িত্ব ছাড়ব।’
তাঁর এই টুইটের পর‌ই তাঁকে নিশানা করেন বিজেপি নেতারা। এরপরই পরবর্তী টুইটে প্রশান্ত কিশোর বলেন, তাঁর দাবি মিলে গেলে কৈলাস বিজয়বর্গীয়, বাবুল সুপ্রিয়র, দিলীপ ঘোষ কি রাজনীতি ছাড়বেন?
যে বিজেপির হাত ধরে ভারতীয় রাজনীতির মানচিত্রে উঠে এসেছিলেন প্রশান্ত কিশোর সেই বিজেপির সঙ্গেই এবার বাংলার ময়দানে ভোট যুদ্ধে নামতে চলেছেন তিনি। কিন্তু এবারে তাঁর কতটুকু মান রক্ষা হবে তা বলা মুশকিল। কারণ তৃণমূলের দলের অন্দরেই ভোট কৌশলী প্রশান্ত কিশোরকে নিয়ে ক্ষোভ পাহাড় প্রমাণ। বেশিরভাগ তৃণমূল নেতার দলত্যাগের অন্যতম কারণ প্রশান্ত কিশোর এবং তাঁর দল।
কিন্তু কে এই প্রশান্ত কিশোর? যাঁর প্রতি এতটা ভরসা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের? নিজে অন্তরালে থেকেও নিয়োগকর্তাকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে অধ্যবসায় চালিয়ে যান রাজনীতির ‘মেঘনাদ’ প্রশান্ত কিশোর ওরফে ‘পিকে’। যেখানে হাত দিয়েছেন, সেখানেই নাকি সোনা উগিয়েছেন। গুজরাত, বিহার, পঞ্জাব, উত্তরপ্রদেশ, অন্ধ্রপ্রদেশ।
আর তাই বঙ্গে ফের ক্ষমতা হাসিলের লড়াইয়ে পশ্চিমবঙ্গে প্রশান্ত। সৌজন্যে তৃণমূল। ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনকে পাখির চোখ করে এবং বিজেপিকে রুখে দিতে এই প্রশান্ত কিশোরেরই হাত ধরছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
প্রশান্ত কিশোরের জন্ম বিহারের রোহতাস জেলার কোরান গ্রামে। পরে ইঞ্জিনয়ারিং পড়তে হায়দরাবাদে যান প্রশান্ত। পড়াশোনার পাঠ মিটিয়ে যোগ দেন রাষ্ট্রপুঞ্জের স্বাস্থ্য বিভাগে। কর্মস্থল ছিল আফ্রিকা। আট বছর চাকরির পর ২০১১ সালে ফিরে আসেন দেশে। তৈরি করেন নিজের সংস্থা সিটিজেন্স ফর অ্যাকাউন্টেবল গভর্নমেন্ট (সিএজি)। নিজের সংস্থায় নিয়োগ করেন আইআইটি-আইআইএম-এর পেশাদার লোকজনকে। পরের বছরই বিধানসভার ভোট গুজরাতে। ভোটের রণকৌশল তৈরি করতে এই প্রশান্ত কিশোরকেই নিয়োগ করেন তখনকার গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।

সেখানে অসাধ্য সাধন করেন। কারণ ২০০১ সাল থেকে গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। উন্নয়ন হলেও দীর্ঘদিন সরকারে থাকায় প্রশাসন বিরোধী হাওয়া ছিল। কিন্তু মোদীর সেই উন্নয়নের সঙ্গে ঐক্যের বার্তা জুড়ে ব্যাপক প্রচার-কৌশল রচনা করেন প্রশান্ত। সোশ্যাল মিডিয়া থেকে গোটা গুজরাত জুড়ে প্রচারের এমন কৌশল তৈরি হয়, যাতে ফের ক্ষমতায় আসতে অসুবিধা হয়নি মোদীর। সেই সাফল্যের হাত ধরেই প্রশান্ত পান আরও বড় দায়িত্ব। গুজরাতের গণ্ডি ছাড়িয়ে জাতীয় স্তরে নিজেকে তুলে ধরার দায়িত্বও তাঁর কাঁধেই সঁপে দেন মোদী। তার পরই তৈরি হয় ‘ব্লু প্রিন্ট’। সেই সময়ই প্রশান্তের মস্তিষ্ক থেকে বেরোয় ‘চায়ে পে চর্চা’, ‘রান ফর ইউনিটি’র মতো একের পর এক দুর্দান্ত পরিকল্পনা। আর সেই সবের হাত ধরেই দেশ জুড়ে বিপুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন মোদী। ফল ২০১৪ সালে গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী থেকে প্রধানমন্ত্রীর পদে উত্তরণ।

কিন্তু যে বিজেপির হাত ধরে পরিচিতিতে এলেন প্রশান্ত শুরু হলো সমস্যা। বর্তমান কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অঅমিতশাহ এবং দলের আরও কয়েকজন নেতার সঙ্গে মনোমালিন্যে মোদী ‘সঙ্গ’ ছাড়লেন পিকে। এর মধ্যেই ২০১৫ সালের গোড়ায় যোগ দেন নীতীশ কুমারের রাজনৈতিক স্ট্র্যাটেজিস্ট হিসেবে। ওই বছরই বিহার বিধানসভার ভোট। জনতা পরিবার এবং কংগ্রেস মিলে মহাজোট তৈরি করে ভোটে লড়ে। তাতে বিপুল সাফল্য পায় মহাজোট। বিহারের মুখ্যমন্ত্রী হন নীতীশ কুমার। নীতীশের ঘনিষ্ঠ মহল সূত্রে জানা যায়, ওই সময় অঞ্চলভিত্তিক ভাগ করে সেখানকার সমস্যা বুঝে নীতীশের বক্তব্যের বয়ান তৈরি করে দিতেন প্রশান্ত।

পিকের একের পর এক সাফল্য নজর কেড়েছিল বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। ২০১৯ এর লোকসভা ভোটে চূড়ান্ত খারাপ ফল করার পর তৃণমূল সুপ্রিমো ডাক পারেন ভোট কৌশলী প্রশান্ত কিশোরকে। বাংলায় ঢুকেই ,’মাস্টার স্ট্রোক’! জনসংযোগ বাড়াতে প্রশান্ত কিশোরের প্রথম পদক্ষেপ ‘দিদিকে বলো’!

বাংলায় কি ভবিষ্যৎ 'বহিরাগত' প্রশান্ত কিশোরের? মোদীর হাতে উত্থান, পতন কি মমতা সঙ্গে? জানুন বিস্তারিত

কিন্তু বাংলায় লোকসভা থেকেই নিজেদের ঘর গোছাতে শুরু করেছিল বিজেপি। তৃণমূলের থেকে কোন‌ও অংশে এখন শক্তিতে পিছিয়ে নেই গেরুয়া শিবির। উল্টে সেখানে জাহাজ দুলছে তৃণমূলের‌ই! একাধিক তৃণমূল নেতার দল পরিবর্তনে ধার কমছে শাসকদলের।

যেখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপিকে ‘বহিরাগত’ বলে আক্রমণ করছেন সেখানে খোদ তৃণমূলের ভোট কৌশলীই ‘বহিরাগত’! বেশিরভাগ তৃণমূল নেতার ক্ষোভের কারণ‌ও তিনিই!  ‘দিদিগিরি’ চলতে পারে কিন্তু বাংলায় বিহারি প্রশান্ত কিশোরের দাদাগিরি মানতে নারাজ তৃণমূলের প্রবীণ নেতারা। আর এতেই চলছে দলে ভাঙন।

আসন্ন বিধানসভা নির্বাচন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে ঠিক যতটা গুরুত্বপূর্ণ ততটাই গুরুত্বপূর্ণ ভোট কৌশলী প্রশান্ত কিশোরের কাছে! মানসম্মানের ব্যাপার! যে বিজেপির সঙ্গ ধরে উত্থান সেই বিজেপির সামনে মাথা নোয়াতে নারাজ পিকে‌ও! আর প্রশান্তকে এই বিপদ থেকে উদ্ধারে এবার নেমেছেন তাঁর মিডিয়া বন্ধুরা।

আজ প্রায় একই সময়ে প্রকাশিত দুটি সর্বভারতীয় পত্রিকা দাবি করে কিভাবে বাংলায় প্রশান্ত কিশোর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার বিজেপির জাগরনের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। পশ্চিমবঙ্গের ৯টি জেলায় কিভাবে সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি করছে তৃণমূল তাও লেখা হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় ২৯৪ আসনে প্রায় ১০০টি আসনের ভবিষ্যৎ ঠিক করে দিতে পারে ৩০% মুসলিম ভোট। কাজেই ক্ষমতায় থাকতে মরিয়া তৃণমূল কংগ্রেস ও প্রশান্ত কিশোরের নজর যে সেই দিকেই সেটাও স্পষ্ট করা হয়েছে।

কিন্তু দিনশেষে অপেক্ষা আগামী বছরের। নির্ধারিত হবে বিজেপি, তৃণমূল ও প্রশান্ত কিশোরের ভবিষ্যৎ!

RELATED Articles