হাকিমপুর সীমান্তে গত কয়েকদিন ধরেই যেন অন্য চিত্র। সকাল হোক বা বিকেল—বাক্স-প্যাঁটরা হাতে একদল মানুষ দাঁড়িয়ে থাকছেন ওপার যাওয়ার অপেক্ষায়। কারও কোলে ছোট্ট শিশু, কারও বা হাতে পুরনো ব্যাগ। এমন দৃশ্য নতুন নয়, তবে সাম্প্রতিক SIR নিয়ে উত্তেজনার মাঝে ভিড়ের কারণ নিয়ে এলাকায় নানা প্রশ্ন ঘুরছে। কারও বাড়ি খুলনা, কারও বরিশাল, আবার কারও দীর্ঘদিনের বসবাস হাওড়া বা কলকাতার গলিতে। কিন্তু সবাই এখন ফিরতে চাইছেন কেন? এখানেই তৈরি হয়েছে নতুন রাজনৈতিক আলোচনা।
বাংলাদেশিরা কীভাবে প্রথমে ভারতে ঢুকেছিলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন এলাকার মানুষ। তৃণমূল কংগ্রেস BSF-কে একাধিকবার নিশানা করেছে, আবার পাল্টা অভিযোগ করছে বিজেপি। এই রাজনৈতিক তরজার মধ্যেই সীমান্তে জড়ো হওয়া বাংলাদেশিদের কথায় উঠে আসছে ভিন্ন গল্প। কেউ বলছেন দালালের হাত ধরে এসেছিলেন, কেউ বা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নদী সাঁতরে। একেকজনের কথায় একেক রকম অভিজ্ঞতা, কিন্তু সবার স্বীকারোক্তি এক—তাদের কাছে ভারতের কোনও বৈধ নথি নেই।
এই দলে ছিলেন মাকসুদা বিবি নামের এক মহিলা। তিনি স্পষ্টই জানিয়েছেন, “তিন বছর এখানে ছিলাম, ফ্ল্যাটে কাজ করতাম। দালালের মাধ্যমে এসেছিলাম। আড়াই হাজার টাকা নিয়েছিল। ঘোজাডাঙা সীমান্ত দিয়ে ঢুকেছিলাম।” তাঁর কথায়, কোনও সরকারি সুবিধা বা নথি তাদের হাতে ছিল না। আবার বিপরীত অভিজ্ঞতার কথা জানালেন মুরাদ গাজী। তিনি জানান, দালালের টাকা দিতে না পেরে পরিবার নিয়ে নদী সাঁতরেই এসেছিলেন। “আমরা অনুপ্রবেশকারী। SIR চালু হওয়ায় আমাদের রাখবে না, তাই ফিরে যাচ্ছি,” বললেন তিনি। হাওড়ার কাছে ঝুপড়িতে থাকতেন, ময়লার কাজ করতেন—এই জীবন ছেড়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়েই বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি।
এক বাংলাদেশি মহিলা আসমা জানান, বরিশাল থেকে চিকিৎসার জন্য ২০২২ সালে এসেছিলেন। দালালকে ৫৫০০ টাকা দিতে হয়েছিল। এখন তাঁরও কোনও নথি নেই। তাই বাধ্য হয়ে তাঁকেও ফিরতে হচ্ছে। এই সব অভিজ্ঞতা মিলিয়ে বোঝা যাচ্ছে, অনেকেই কাজ, চিকিৎসা বা টিকে থাকার চাপে অবৈধ পথে এসেছিলেন। এখন SIR কার্যকর হওয়ায় তাঁদের আর থাকার জায়গা নেই—এমনই মত সকলের।
আরও পড়ুনঃ “তোর ঘর বাড়ি ভাঙচুর করব… তোকে রাতেই জবাই করব!”— ভাইরাল অডিয়ো ক্লিপে বিস্ফোরক হুমকি, সন্দেশখালিতে তৃণমূল কর্মী গ্রেফতার! “এসআইআর আটকাতেই বিএলও-দের ভয় দেখাচ্ছে শাসকদল”- অভিযোগ বিজেপির!
আগের তুলনায় ভিড় কিছুটা কম হলেও উদ্বেগ যেন কমেনি। ছোট্ট শিশুকে কোলে নিয়ে অপেক্ষা করলেন কেউ, আবার কেউ ক্লান্ত মুখে বসে আছেন মাটিতে। রাজনৈতিক তরজা, প্রশাসনিক তৎপরতা আর অনিশ্চয়তার মাঝেই তারা দাঁড়িয়ে—ক্যামন করে এসেছিলেন, কেন এসেছিলেন, কী অবস্থায় ফিরছেন—সবটাই যেন মিশে গেছে সীমান্তের বাতাসে। তাদের স্বীকারোক্তি এখন নতুন করে প্রশ্ন তুলছে—দালালচক্র, সীমান্ত সুরক্ষা ও অনুপ্রবেশ–এই তিনটির আসল সত্যটা ঠিক কোথায়?





