সকল বাধা টপকে বাজিমাত বঙ্গ কন্যার! UPSC-তে বাংলাকে গর্বিত করলেন মেঘনা চক্রবর্তী!

আজও বহু বাঙালি পরিবারে সকালে চা খেতে খেতে চলতি বছরের UPSC রেজাল্ট নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। কে প্রথম, বাংলার কেউ টপ করল কিনা, এসব নিয়ে কৌতূহলের শেষ নেই। আর এই কৌতূহলের অবসান ঘটালেন এক তরুণী—কলকাতারই মেয়ে মেঘনা চক্রবর্তী (Meghna Chakraborty), যিনি এবারের UPSC সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় গোটা বাংলার মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেছেন। মেঘনার এই সাফল্য শুধু তাঁর ব্যক্তিগত গর্ব নয়, গোটা বাংলার গর্ব। তাঁর গল্প শুধু অনুপ্রেরণার নয়, বরং প্রমাণ করে দেয়—স্বপ্ন সত্যি হয়, যদি থাকে জেদ আর লক্ষ্যভেদ করার স্পষ্ট রূপরেখা।

আজ আমরা জানব, সেই মেঘনার জীবনের কথা—যিনি বাংলা থেকে সারা দেশের সামনে প্রমাণ করলেন, নিরন্তর পরিশ্রমের কোনও বিকল্প হয় না। শুধুই কী ইউপিএসসির মতো কঠিন পরীক্ষা সফলভাবে উত্তীর্ণ হলেন তিনি? না যাকে বলে, দারুন সফলভাবে উত্তীর্ণ হলেন! সর্বভারতীয় এই পরীক্ষায় ৭৯ নম্বর স্থান দখল করে তিনি গর্বিত করছেন বাংলাকে। দেশব্যাপী হ‌ওয়া এই কঠিন প্রতিযোগিতায় তিনি রীতিমতো নিজের যোগ্যতাকে চিনিয়েছেন।

প্রশ্ন: আপনি কোথা থেকে পড়াশোনা করেছেন?
মেঘনা: আমার পড়াশোনার শুরুটা মুম্বইয়ে। বাবা-মা’র চাকরির সূত্রে সেখানে বেশ কয়েকটা বছর কাটে। পরে ষষ্ঠ শ্রেণিতে কলকাতায় ফিরে আসি। এখানেই আমার স্কুলজীবন কাটে ‘মডার্ন হাই স্কুল ফর গার্লস’-এ। স্নাতক ডিগ্রি আমি লাভ করি দিল্লির সেন্ট স্টিফেনস কলেজ থেকে, ইতিহাস বিষয়ে। এরপর জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় (JNU) থেকে রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে স্নাতকোত্তর সম্পূর্ণ করি।

প্রশ্ন: আপনি UPSC পরীক্ষায় বসার সিদ্ধান্ত কেন নিলেন?
ঘেঘনা: ছোট থেকেই সমাজ নিয়ে ভাবতাম। মা শিক্ষিকা ছিলেন, তিনিই আমায় শিক্ষা দিয়েছেন দেশের মানুষের জন্য কিছু করার মূল্য। কলেজে পড়ার সময় দেখলাম—কীভাবে প্রশাসনিক স্তর থেকে বদল আনা যায় মানুষের জীবনে। বিশেষ করে কোভিড-পরবর্তী সময়ে যখন গ্রামাঞ্চলে অসহায়তার ছবি চোখে পড়ল, তখন উপলব্ধি হল—এই পরীক্ষার মাধ্যমে সমাজে বাস্তব পরিবর্তন আনা সম্ভব। তখন থেকেই ঠিক করি, UPSC আমার লক্ষ্য।

প্রশ্ন: কীভাবে আপনি এই পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছেন?
মেঘনা: প্রথম বছর দিল্লিতে ‘রাও’স আইএএস’-এ ভর্তি হই। কিন্তু বাড়ির পরিবেশ, মায়ের সাহচর্য আমাকে টানতে থাকে। ফলে দ্বিতীয় বছর কলকাতায় ফিরে এসে সম্পূর্ণভাবে নিজের মত করে পড়া শুরু করি। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় ধরে পড়তাম, হাতেকলমে নোট তৈরি করতাম। অনলাইন মক টেস্টে অংশ নিতাম নিয়মিত। ইন্টারভিউ প্রস্তুতির জন্য ‘সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর সিভিল সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টার’-এর সহায়তাও নিই।

প্রশ্ন: পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য আপনার কী পরামর্শ থাকবে?
মেঘনা: প্রথমে নিশ্চিত হতে হবে—আপনি সত্যিই এই পথ বেছে নিতে চান কিনা। এই সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর পরই নিজেকে সময় ও মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে হবে। সিলেবাস অনেক বড়—তাই স্ট্র্যাটেজি বানানো জরুরি। সব বিষয় একসঙ্গে নয়, বরং নিজের সুবিধামতো ভাগ করে পড়া উচিত। ‘স্মার্ট স্টাডি’ করাটাই এখানে মূল চাবিকাঠি। মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রশ্ন: এই যাত্রাপথে আপনি কী কখনও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন?
মেঘনা: হ্যাঁ, আমার প্রথম অ্যাটেম্পটে আমি প্রিলিমসেই বাদ পড়েছিলাম। প্রচণ্ড ভেঙে পড়েছিলাম, নিজেকে অযোগ্য মনে হচ্ছিল। কিন্তু তারপর একরকম জেদ চেপে যায়। বুঝতে পারি—সমস্যাটা আমার প্রস্তুতিতে নয়, বরং পদ্ধতিতে। সেই ভুল শুধরে নিয়ে আবার নতুন করে শুরু করি। এবার বাড়িতে থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে সফল হতে পেরেছি।

প্রশ্ন: প্রস্তুতির সময় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী ছিল?
মেঘনা: এই পরীক্ষার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল স্থিরতা ধরে রাখা। চারপাশে যখন সবাই এগিয়ে চলেছে, তখন নিজেকে একঘরে করে শুধুই বই নিয়ে বসে থাকা কঠিন। মাঝে মাঝে আত্মবিশ্বাসেও চিড় ধরে। তবে আমি সবসময় নিজের লক্ষ্যটা মনে রাখতাম। প্রতিদিন নিজেকে মনে করাতাম—এই সাফল্য একদিন আসবেই।

প্রশ্ন: আপনি কোন সার্ভিস প্রথম পছন্দ করছেন এবং কেন?
মেঘনা: IAS—এটাই আমার প্রথম পছন্দ। কারণ আমি বিশ্বাস করি, একমাত্র এই পদে থেকেই সমাজে সরাসরি প্রভাব ফেলা সম্ভব। জেলা পর্যায়ে কাজ করার সুযোগ পাওয়া যায়। বাস্তব সমস্যার মুখোমুখি হয়ে সমাধান করার ক্ষমতা তৈরি হয়। আমি চাই সাধারণ মানুষের পাশে থেকে, তাঁদের জীবন মান উন্নত করতে।

প্রশ্ন: আপনি ভবিষ্যতে নিজেকে কীভাবে দেখতে চান?
মেঘনা: আমি চাই মাঠে নেমে কাজ করতে। জেলা প্রশাসক হিসেবে কাজ করে মানুষের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত হতে। পরে কেন্দ্রীয় স্তরে কাজ করে বৃহত্তর নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে যুক্ত হতে চাই। সমাজের জন্য কিছু করতে পারাই আমার ভবিষ্যতের মূল লক্ষ্য।

প্রশ্ন: আপনি বর্তমানে সমাজের প্রধান সমস্যা কী মনে করেন?
মেঘনা: আমার মতে, এই মুহূর্তে দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা—বেকারত্ব ও শিক্ষার অভাব। বহু যুবক-যুবতী আজও চাকরির জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছেন। শিক্ষাব্যবস্থায় প্রয়োগমুখী জ্ঞানের অভাব রয়েছে। আরও বাস্তবমুখী শিক্ষার দরকার। পাশাপাশি, দারিদ্র্য, স্বাস্থ্য পরিষেবার অভাব—এই সমস্যাগুলোকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।

প্রশ্ন: আপনি মনে করেন এই দু’টি সমস্যার মধ্যে কোনটি আগে সমাধান করা উচিত?
মেঘনা: দু’টি একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তবে আমি মনে করি, প্রথমে বেকারত্ব কমাতে হবে। কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়লে দারিদ্র্যতা এমনিতেই কমবে। সরকারি ও বেসরকারি স্তরে যৌথ উদ্যোগে যুবসমাজকে দক্ষ করে গড়ে তোলার প্রয়োজন।

প্রশ্ন: আপনি দারিদ্র্যতা সম্পর্কে কী মনে করেন?
মেঘনা: একটা দেশে প্রকৃত উন্নয়ন তখনই হয়, যখন সমাজের শেষ সারির মানুষও এগিয়ে যেতে পারে। অথচ আমরা আজও এমন পরিবার দেখি, যারা তিন বেলা খাবার জোগাড় করতে পারেন না। এটা অত্যন্ত লজ্জার। তাই প্রশাসনের প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত—নূন্যতম বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও খাদ্যের নিশ্চয়তা প্রদান করা।

মেঘনা চক্রবর্তীর গল্প শুধুমাত্র এক সফল UPSC পরীক্ষার্থীর কাহিনি নয়—এ এক সংগ্রামের, অধ্যবসায়ের, এবং আত্মবিশ্বাসের জীবন্ত উদাহরণ। তাঁর প্রতিটি উত্তরে ফুটে উঠেছে বাস্তব জীবনের স্পর্শ, মা-বাবার ত্যাগ, নিজের সীমাবদ্ধতাকে ছাপিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা এবং সমাজের জন্য কিছু করার জেদ। আজকের প্রজন্মের অনেকেই যখন দ্রুত সফলতার খোঁজে ছুটছে, তখন মেঘনার এই ধৈর্য, পরিশ্রম আর স্থিরতা একটা বড় বার্তা দেয়—সাফল্য পাওয়া যায়, যদি মন থেকে চেষ্টা করা যায়।

আরও পড়ুনঃ মে মাসে বিরল গ্রহযোগ! কেবল এই তিন রাশির ভাগ্যে আসছে সাফল্যের সুযোগ !

মেঘনার এই সাফল্য বাংলার মাটির, বাংলার শিক্ষার, আর প্রতিটি সেই স্বপ্ন দেখা তরুণ-তরুণীর, যারা বিশ্বাস করে—”আমি পারব”। আর এই বিশ্বাসই একদিন বাস্তবে রূপ নেয়, যেমনটা হল মেঘনার ক্ষেত্রে।

Jui Nag

আমি জুই নাগ, পেশায় নিউজ কপি রাইটার, লেখালেখিই আমার প্যাশন। বিনোদন, পলিটিক্স ও সাম্প্রতিক খবর পাঠকদের সামনে তুলে ধরাই আমার লক্ষ্য। তথ্যভিত্তিক ও আকর্ষণীয় কনটেন্টের মাধ্যমে সঠিক সংবাদ পৌঁছে দিই।

আরও পড়ুন

RELATED Articles