ভোটের দিনেই বাংলায় ‘পরিবর্তনের ঝড়’ দাবি মোদির! কাটমানি-অনুপ্রবেশ ইস্যুতে তৃণমূলকে তোপ! জনসভায় বিপুল ভিড় দেখে আত্মবিশ্বাসি প্রধানমন্ত্রী!

প্রথম দফার ভোটের দিনই বাংলার রাজনীতিতে তীব্র উত্তাপ। চারিদিকে ভোটগ্রহণ চললেও বহু জায়গায় উত্তেজনা, অভিযোগ আর পাল্টা অভিযোগে কার্যত রণক্ষেত্রের ছবি। এই আবহেই রাজ্যে জনসভা করতে এলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। দিনের শুরুতেই কৃষ্ণনগরে সভা, এরপর মথুরাপুরে জনসভা এবং শেষে হাওড়ায় রোড শো, সব মিলিয়ে ভোটের ময়দানে নিজের উপস্থিতি জোরালোভাবে জানান দিলেন তিনি

কৃষ্ণনগরের সভা থেকে নরেন্দ্র মোদি প্রথমেই ভোটারদের অভিনন্দন জানান। তিনি বলেন, গণতন্ত্রের এই উৎসবে সকলের অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর দাবি, গত ৫০ বছরের মধ্যে এ বারই সবচেয়ে কম হিংসার ঘটনা দেখা যাচ্ছে বাংলার নির্বাচনে। আগে যেখানে খুন-হামলা লুকোতে নানা অজুহাত দেওয়া হত, এখন পরিস্থিতি বদলাচ্ছে বলেই তাঁর মন্তব্য। পাশাপাশি তিনি বলেন, রাজ্যের মানুষ ভয় কাটিয়ে উঠে পরিবর্তনের দিকে এগোতে চাইছেন, এবং ভোটদানের হারও রেকর্ড ছুঁতে চলেছে।

ভয় কাটিয়ে পরিবর্তনের ডাক

মোদি তাঁর বক্তব্যে বারবার ‘ভয়মুক্ত বাংলা’র প্রসঙ্গ তোলেন। তাঁর কথায়, এতদিন মানুষ ভয় পেত, কিন্তু এখন সেই ভয় ধীরে ধীরে দূর হচ্ছে। রাজ্যের মানুষ পরিবর্তন চাইছেন বলেই তিনি দাবি করেন। একই সঙ্গে প্রশাসনের উদ্দেশে তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের কথা শুনে সঠিকভাবে কাজ করতে হবে। ভোটের মাধ্যমে মানুষ যেন নির্ভয়ে নিজেদের মত প্রকাশ করতে পারে, সেটাই সবচেয়ে জরুরি, এই বার্তাই দেন তিনি।

‘ঝালমুড়ি’ কটাক্ষে তৃণমূলকে নিশানা

কৃষ্ণনগরের সভা থেকেই তৃণমূলকে কটাক্ষ করতে ‘ঝালমুড়ি’র উদাহরণ টানেন মোদি। তিনি বলেন, ৪ মে বাংলায় বিজেপির বিজয় উৎসব হবে এবং সেই দিন ঝালমুড়িও খাওয়া হবে। তবে তাঁর মন্তব্য, এই ঝালমুড়ির ঝাল যেমন তীব্র, তেমনই তৃণমূলের রাজনীতিও মানুষের কাছে এখন তেতো হয়ে উঠেছে। তাঁর অভিযোগ, রাজ্যের শাসকদলের নেতারা বিভিন্ন স্তরে ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন এবং সাধারণ মানুষের সুযোগ-সুবিধা আটকে দিচ্ছেন।

জঙ্গলরাজের বিরুদ্ধে শঙ্খধ্বনি

মোদি বলেন, ১৫ বছর আগে বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে মানুষ শুধু আওয়াজ তুলেছিল, কিন্তু এ বার তৃণমূলের ‘জঙ্গলরাজ’-এর বিরুদ্ধে শঙ্খধ্বনি শুরু হয়েছে। তিনি দাবি করেন, এই লড়াই কোনও দলীয় লড়াই নয়, বরং মানুষের অধিকার ও উন্নয়নের জন্য লড়াই। শিক্ষক, ছাত্র, সাধারণ মানুষ সকলের জন্য ভয়মুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে, প্রশাসনের উপর চাপ নয়, বরং সঠিক নীতিতে কাজ করাই হবে মূল লক্ষ্য।

অনুপ্রবেশ ও দুর্নীতি নিয়ে তোপ

তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণ শানিয়ে মোদি বলেন, রাজ্যে দুর্নীতি ও অনুপ্রবেশ বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁর অভিযোগ, তৃণমূল শুধু লুটপাটে ব্যস্ত এবং সাধারণ মানুষের কথা ভাবছে না। তিনি আশ্বাস দেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং লুটের টাকা মানুষের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করতে পুলিশ, বিএসএফ ও সাধারণ মানুষের সমন্বয়ের কথাও বলেন তিনি।

মতুয়া ও নাগরিকত্ব প্রসঙ্গ

মোদি মতুয়া সম্প্রদায়ের উদ্দেশে বলেন, তাঁদের কোনও ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই। ধর্মীয় নির্যাতনের কারণে যাঁরা ভারতে এসেছেন, তাঁদের নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি পুনরায় তুলে ধরেন তিনি। ৪ মে-র পর নতুন সরকার গঠিত হলে সিএএ কার্যকর করে এই প্রক্রিয়া আরও দ্রুত করা হবে বলেও জানান।

মহিলা ও উন্নয়ন ইস্যুতে প্রতিশ্রুতি

মহিলা সংরক্ষণ বিল নিয়েও সরব হন মোদি। তাঁর অভিযোগ, তৃণমূল চায় না মহিলাদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ুক। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, রাজ্যের প্রতিটি ব্লকে মহিলা থানা গড়ে তোলা হবে এবং মহিলাদের আর্থিক সহায়তার জন্য বিশেষ প্রকল্প চালু করা হবে। ‘মাতৃশক্তি ভরসা’ কার্ডের মাধ্যমে মহিলাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে অর্থ সহায়তা দেওয়ার কথাও বলেন তিনি, পাশাপাশি সন্তান লালনপালনের জন্য অতিরিক্ত সহায়তার আশ্বাস দেন।

মথুরাপুরে মৎস্যজীবী থেকে গঙ্গাসাগর, একাধিক ইস্যুতে আক্রমণ

মথুরাপুরের সভা থেকেও তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে তোপ দাগেন মোদি। মৎস্যজীবীদের সমস্যার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, তাঁদের সুরক্ষা ও আয়ের বিষয়ে কেন্দ্র ইতিমধ্যেই নানা পদক্ষেপ নিয়েছে, কিন্তু রাজ্যে সেই সুবিধা পৌঁছচ্ছে না। কাটমানি, সিন্ডিকেট রাজ এবং দুর্নীতির অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, এখানে কোনও কাজই ঘুষ ছাড়া হয় না। গঙ্গাসাগরের উন্নয়ন, সেতু নির্মাণ, ভাঙা মেলার অব্যবস্থা, সব কিছু নিয়েই রাজ্য সরকারের সমালোচনা করেন তিনি। তাঁর দাবি, এত বছর ধরে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে কোনও উন্নয়ন হয়নি।

আরও পড়ুনঃ আসানসোলে উত্তেজনা, বিজেপি প্রার্থীর গাড়িতে হামলা! গাড়ির উপর পরপর পাথর বর্ষণ! দুমড়ে মুচড়ে গেল গাড়ি! কি অবস্থায় রয়েছেন অগ্নিমিত্রা?

সবশেষে জনসভায় উপস্থিত ভিড় দেখে আপ্লুত হয়ে মোদি বলেন, এই সমর্থনই প্রমাণ করছে যে বাংলায় পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। গ্রাম থেকে শহর সব জায়গা থেকেই একটাই আওয়াজ উঠছে, পরিবর্তন দরকার। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, এই নির্বাচনে বিজেপির পক্ষে জনমত তৈরি হচ্ছে বলেই তিনি মনে করছেন।

Khabor24x7 NewsDesk

আরও পড়ুন

RELATED Articles