জীবনসংগ্রাম! পোলিও থাবা বসালেও কেড়ে নিতে পারে নি মনের জোর, লাঠির উপর ভর দিয়েই নতুন প্রজন্ম গড়ছেন শিক্ষিকা ‘ফতেমাদি’

অনেক ছোটবেলায় শরীরে থাবা বসায় পোলিও। কিন্তু তাঁর মনের জোর ছিল অটল। সমস্ত প্রতিকূলতাকে পেরিয়ে জীবনযুদ্ধে জয়ী তিনি। নিজের এক পা দুর্বল হলেও লাঠিতে ভর দিয়েই আগামী প্রজন্মকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য প্রস্তুত করেন ‘ফতেমাদি’। স্কুলের সকলের কাছে তিনি একজন আদর্শ শিক্ষিকা।

কে এই ফতেমা জিন্না?

ফতেমা জিন্না হলেন হুগলির বৈঁচি বীণাপাণি বালিকা বিদ্যলয়ের শিক্ষিকা। একবছর বয়সে খুব জ্বর হয় তাঁর। চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গেলে তিনি জানতে চান, পোলিও ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে কী না। তা দেওয়া হয়নি বলায় ভ্যাকসিন দিয়ে দেন চিকিৎসক। কিন্তু তারপরও হামা দিয়ে হাঁটার বয়সে হাঁটতে না পারা। ফতিমার এক কাকাও পোলিও আক্রান্ত হয়েছিলেন। মেয়ের উপসর্গ দেখে বাবার বুঝতে অসুবিধা হয়নি। এরপর নানান জায়গায় নানান চিকিৎসক দেখালেও কোনও লাভ হয়নি। পঙ্গুই হয়ে গেল, এটাই ধরেই নিয়েছিল ফতেমার পরিবার। আর এরপরই শুরু হয় ফতেমার লড়াই।

শারীরিক প্রতিকূলতাকে সঙ্গী করেই মেমারির গ্রামের প্রাথমিক স্কুলে ভর্তি। কোনও মতে পা টেনে টেনে যেতেন স্কুলে। লাঠিকে সম্বল করেই এগোতে থাকেন আগামীর পথে। তবে চলার পথে গঞ্জনাও শুনতে হয়েছে অনেক। লাঠিতে ভর দিয়ে হাট গোবিন্দপুর কলেজ থেকে গ্রাজুয়েশন পাশ করেন।

২০০৫ সালে স্কুল সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষা বসেন। পাশ করে ২০০৬ সালে বৈঁচি বীণাপানি বালিকা বিদ্যালয়ে চাকরিতে যোগ দেন। ২০০৮ সালে বিয়ে করেন ফতেমা। এরপর কেটে গিয়েছে ১৭ বছরের বেশি সময়। ধীরে ধীরে গোটা স্কুলের পড়ুয়াদেরই খুবই কাছের হয়ে ওঠেন তিনি। পড়ুয়াদের যে কোনও সমস্যায় সকলের মুখে একটাই নাম ‘ফাতেমাদি’। সকলকে নিজের সন্তানের মতো আগলে রাখেন তিনি।

কী জানালেন ফতেমা?

ফতেমা বলেন, “জীবনে চলার পথে অনেক সময় কটূক্তি শুনতে হয়েছে। প্রথম প্রথম সেগুলোতে কষ্ট পেতাম। পরে ভেবেছি যেটা সত্যি সেটাই তো মানুষ বলছে। আর পাত্তা দিইনি।ভালো করে হাঁটতে না পারার কারণে কোনদিনও প্রাইভেট টিউশন নিতে পারিনি। আরেকটু ভালো গাইডেন্স পেলে হয়তো আমি অন্য কিছু হতে পারতাম। তবে এখন যেখানে আছি, যে স্কুলের আমি শিক্ষিকা হয়েছি এখানে সবাই খুবই ভালো। সহশিক্ষিকারা, ছাত্রীরা এত ভালবাসে সম্মান করে আর কী চাই”।

বৈঁচি গ্রামে আসগর আলি মণ্ডলের সঙ্গে বিয়ে হয়েছে ফতেমার। তাদের একমাত্র ছেলে আমন ক্লাস ফাইভের ছাত্র। ফতেমার স্বামী বলেন, “অনেক প্রতিকুলতা পেড়িয়ে অনেক গঞ্জনা সয়ে ফাতেমা এই জায়গায় এসেছে। আমরা খুবই সুখী”। ফাতেমার পাশে সর্বদাই থাকেন তাঁর স্কুলের সহকর্মীরাও। 

RELATED Articles