বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কতটা অটুট? বিচারপতি বদল চেয়ে মামলা সরানোর আবেদন কি স্বাভাবিক ঘটনা? সাধারণ মানুষের চোখে আদালত হলো শেষ ভরসার জায়গা, যেখানে সত্যের জয় হয়, অন্যায়ের বিচার হয়। কিন্তু যদি বিচার ব্যবস্থার মধ্যেই প্রশ্ন উঠে, তাহলে সেই আস্থার জায়গাটা কি নড়বড়ে হয়ে যায়? সম্প্রতি কলকাতা হাইকোর্টের এক ঘটনা ঘিরে এই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে।
কোনও মামলার রায় নিয়ে এক পক্ষ সন্তুষ্ট হবে, আরেক পক্ষ নয়— এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই মামলাটি কোন বিচারপতির এজলাসে থাকবে, তা নিয়ে যখন আইনজীবীরা সরব হন, তখন বিষয়টি আর মামলার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে না। তখন তা হয়ে ওঠে বিচার ব্যবস্থার অন্দরমহলের বিতর্ক। ঠিক এমনটাই ঘটেছে কলকাতা হাইকোর্টে, যেখানে বিচারপতি বিশ্বজিৎ বসুর এজলাস থেকে একটি মামলা সরানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে রাজ্য সরকার। সেই মামলার সঙ্গে জড়িয়ে আছেন একাধিক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, যার ফলে বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে।
সম্প্রতি গোর্খা টেরিটোরিয়াল প্রশাসন (জিটিএ) শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির মামলায় বিচারপতি বিশ্বজিৎ বসুর এজলাস থেকে মামলা সরানোর দাবি তোলে রাজ্য সরকার। কিন্তু সমস্যার সূত্রপাত তখনই, যখন এই মামলাটি প্রধান বিচারপতি টি এস শিবজ্ঞানম বিচারপতি বসুর এজলাসেই ফেরত পাঠান। এরপরই হাইকোর্টে কার্যত নাটকীয় পরিস্থিতি তৈরি হয়। রাজ্যের আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি বলেন, “এই মামলা এই এজলাস শুনতে পারে না।” তার দাবি, প্রধান বিচারপতির এমন সিদ্ধান্ত প্রশাসনিক নিয়মভঙ্গ করেছে।
এই মন্তব্যেই কার্যত সারা আদালত চত্বরে শোরগোল পড়ে যায়। বিচারপতি বসু অবশ্য স্পষ্ট করে দেন, তিনি এই মামলা নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে আগ্রহী নন, বরং প্রধান বিচারপতি নিজে এই মামলা তার এজলাসে পাঠিয়েছেন বলেই তিনি শুনানি করছেন। তবুও রাজ্যের আপত্তি কমেনি।
এই মামলায় অভিযুক্ত হিসেবে নাম রয়েছে তৃণমূল ছাত্র পরিষদ নেতা তৃণাঙ্কুর ভট্টাচার্য, জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক ঘনিষ্ঠ নেতা বুবাই বোস, স্কুল পরিদর্শক প্রাণগোবিন্দ সরকার-সহ আরও কয়েকজনের। মূল অভিযোগ, জিটিএ-তে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে, এবং এই বিষয়ে হাইকোর্ট আগে সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিল। রাজ্য সরকার সেই রায় চ্যালেঞ্জ করলেও, শেষ পর্যন্ত ডিভিশন বেঞ্চ সিবিআই তদন্ত বহাল রাখে। সুপ্রিম কোর্টে গিয়েও রাজ্য কিছুটা স্বস্তি পায়, কারণ সেখানে সিবিআই তদন্তের উপর সাময়িক স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়।
আরও পড়ুনঃ ‘সাদামাটা’ অরিজিৎ নাকি কোটি টাকার গায়ক? রবীন্দ্রসঙ্গীতের জন্য বিপুল অঙ্ক চাওয়ায় বিতর্ক!
এখন প্রশ্ন উঠছে, কেন রাজ্য এত মরিয়া হয়ে বিচারপতি বসুর এজলাস থেকে মামলা সরাতে চাইছে? রাজনৈতিক মহলে কানাঘুষো, কিছু প্রভাবশালী নেতা এই মামলায় জড়িত, এবং বিচারপতি বসুর কড়া মনোভাবের কারণে তারা আশঙ্কিত। অন্যদিকে, রাজ্য সরকার বিষয়টিকে প্রশাসনিক নিয়মের লঙ্ঘন হিসেবেই দেখাতে চাইছে। শেষ পর্যন্ত আদালত কী সিদ্ধান্ত নেয়, তার দিকেই তাকিয়ে রয়েছে সবাই। তবে এই ঘটনা বিচার ব্যবস্থার স্বাধীনতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে, যা আগামী দিনে আরও বিতর্ক উসকে দিতে পারে।





