পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলে একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক ক্রমশ তীব্র হয়েছে। শিক্ষক নিয়োগ, পুরসভা, পঞ্চায়েত থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রশাসনিক ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ ইতিমধ্যেই রাজ্যের রাজনৈতিক পরিবেশকে উত্তপ্ত করে তুলেছে। এবার নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে রাজ্যের আবগারি নীতি এবং মদের ব্যবসা সংক্রান্ত একটি বিতর্কিত রিপোর্ট। এই রিপোর্টকে কেন্দ্র করে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ উঠেছে।
প্রকাশিত রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, ২০১৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের আবগারি নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছিল। তার আগে রাজ্যে বিদেশি মদ ও বিয়ারের পাইকারি ব্যবসা পরিচালনা করত লাইসেন্সপ্রাপ্ত একাধিক বেসরকারি সংস্থা। মোট ৫৫টি সংস্থা প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে ব্যবসা করত বলে দাবি করা হয়েছে। এর ফলে বাজারে স্বাভাবিক প্রতিযোগিতা বজায় থাকত এবং খুচরো ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন সরবরাহকারীর মধ্যে নিজেদের পছন্দমতো সংস্থা বেছে নিতে পারতেন। কিন্তু নতুন নীতি কার্যকর হওয়ার পর সেই ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসে বলে অভিযোগ।
রিপোর্ট অনুযায়ী, নতুন নীতির আওতায় ওয়েস্ট বেঙ্গল স্টেট বেভারেজ কর্পোরেশন লিমিটেড নামে একটি সংস্থার মাধ্যমে মদের পাইকারি ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীভূত করা হয়। অভিযোগ, এর ফলে আগের প্রতিযোগিতামূলক কাঠামো ভেঙে গিয়ে নির্দিষ্ট কিছু ডিস্ট্রিবিউটর ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর হাতে বাজারের নিয়ন্ত্রণ চলে যায়। আরও দাবি করা হয়েছে যে, মদ প্রস্তুতকারী এবং বোতলজাতকারী সংস্থাগুলোর উপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি করা হয়। গুদাম ভাড়া, পরিবহণ খরচ এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক খাতের নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগও সামনে এসেছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, এই অতিরিক্ত আর্থিক বোঝার ফলে শিল্পের বহু সংস্থা ক্ষতির মুখে পড়ে।
এই বিতর্কের মধ্যেই সামনে এসেছে আইএফবি এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের একটি চিঠির উল্লেখ। সেই চিঠিতে সংস্থার পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে, দীর্ঘদিন ধরে তারা বিভিন্ন ধরনের প্রশাসনিক চাপ ও আর্থিক দাবির সম্মুখীন হয়েছে। সংস্থার দাবি, ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে নানা বাধার মুখে পড়তে হয়েছে এবং অভিযোগগুলির নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। যদিও এই অভিযোগগুলির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি দফতর বা অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের আবহেই বিতর্ক আরও জোরদার হয়েছে।
এদিকে বিজেপি নেতা ও মন্ত্রী তাপস রায়ও এই ইস্যুতে সরব হয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, ২০১৭ সালের আবগারি নীতির পরিবর্তনের ফলে একটি সংগঠিত আর্থিক কাঠামো তৈরি হয়েছিল, যার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করা হত। তিনি দাবি করেছেন, এই ব্যবস্থার সঙ্গে তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বের নাম জড়িয়ে রয়েছে। তবে তাঁর এই দাবির পক্ষে এখনও পর্যন্ত কোনও আদালত-স্বীকৃত বা সরকারি তদন্তের চূড়ান্ত রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে রাজনৈতিক মহলে এই অভিযোগ নিয়ে জোর বিতর্ক শুরু হলেও অভিযোগগুলির সত্যতা এখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
আরও পড়ুনঃ মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর নিয়মিত রূপচর্চা করতেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়! নির্বাচনে হারতেই হঠাৎ উধাও ত্বকের জৌলুস! ‘মমতার চেহারার পরিবর্তনের সব দায় আমার নয়!’ বিতর্ক বাড়তেই মুখ খুললেন কেয়া শেঠ, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর রূপচর্চার রহস্য ফাঁস করলেন তিনি?
সমগ্র ঘটনাকে ঘিরে এখন রাজনৈতিক উত্তেজনা তুঙ্গে। একদিকে বিরোধীরা আবগারি নীতির পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি তুলছে, অন্যদিকে শাসকদল এই ধরনের অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেই দাবি করছে। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, যদি অভিযোগগুলির নিরপেক্ষ তদন্ত হয়, তাহলে রাজ্যের আবগারি নীতির বাস্তব চিত্র এবং আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত বহু প্রশ্নের উত্তর সামনে আসতে পারে। তবে তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত এই সমস্ত অভিযোগকে অভিযোগ হিসেবেই দেখা উচিত। এখন নজর থাকবে ভবিষ্যতে সরকার, তদন্তকারী সংস্থা এবং আদালতের পদক্ষেপের দিকে।






