গত সোমবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নির্দেশ দেওয়ার পর থেকেই যেন রাজ্য জুড়ে জুলুমবাজি শুরু হয়েছে পুলিশের। হকার উচ্ছেদের নামে চলছে অত্যাচার। বুলডোজা দিয়ে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে রাস্তার ধারের দোকান, ঝুপড়ি, হোটেল। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এত বছর পর হঠাৎ এমন সক্রিয়তা কেন দেখাচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী? তিনি কী আগে থেকে জানতেন না যে তাঁর দলের একাংশ বা পুলিশের একাংশ এই টাকা নিয়ে হকার বসানোর কাজে লিপ্ত? তাহলে এতদিন পর কেন কড়া হচ্ছেন তিনি?
গতকাল, বৃহস্পতিবারও নবান্নের বৈঠকে বেশ কড়াভাবেই পুলিশ, আমলা, মন্ত্রীদের ধমক দেন। এও বুঝিয়ে দেন যে কাউকেই রেয়াত করা হবে না। টাকা নিয়ে লোক বসালে তাঁর বা তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে এই যে হকারদের এত বাড়বাড়ন্ত বা তৃণমূলের নেতা-পুলিশদের এই নিয়ে ভূমিকা, এসব খবরই মমতার কাছে আগে থেকেই ছিল। তিনি পুলিশ মন্ত্রী, সর্বোপরি মুখ্যমন্ত্রী, তাঁর কাছে যে এই খবর থাকবে, তা তো স্বাভাবিক। তাহলে এতদিন তিনি কেন চুপ ছিলেন? কেন কড়া হাতে হাল ধরেন নি তিনি।
এর নেপথ্যে আসল কারণ হল প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতি। কারণ কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদী সরকার গঠনের পর থেকেই বাংলায় বিজেপি ধীরে ধীরে মাথাচাড়া দিতে থাকে। ফলে গত দশ বছরে অনেক তৃণমূল নেতাই বিজেপির ভয় দেখিয়ে অনেক ধরণের সুযোগ নিয়েছে। উনিশের লোকসভা ভোটের আগে যেমন অনেক তৃণমূল নেতাই বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন। তেমনই চব্বিশের লোকসভা ভোটের সময়ও অনেক তৃণমূল নেতা প্রায় পা বাড়িয়েই ছিলেন পদ্ম শিবিরে ঝাঁপ দেবেন বলে। অনেক নেতা, আমলারাই তলে তলে যোগাযোগ রাখছিলেন শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে। এর ফলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হয়ত ভেবেছিলেন, সেই সময় সকলকে ধমকালে দলে অন্তর্ঘাত হবে বা দলে ভাঙন হবে। সেই কারণেই তিনি চুপ ছিলেন বলা যায়।
চব্বিশের লোকসভা নির্বাচনে বাংলা থেকে বিজেপিই বেশি আসন পাবে বলে মনে হয়েছিল। নানান এক্সিট পোলও তেমনই আভাস দিয়েছিল। অনেকে ভেবেই নিয়েছিলেন বিজেপি বাংলা থেকে ২৭-২৯টা আসন পাচ্ছে। কিন্তু ভোটের ফলাফল বেরোতেই উল্টে গেল সব হিসাব। ১২-তেই থেমে গিয়েছিল বিজেপির রথ। আর সেই ফলাফল দেখে অনেক তৃণমূল নেতা, আমলা বা পুলিশ যারা বিজেপিতে ঝোঁকার কথা ভেবেছিলেন, তারা আবার নিজ নিজ স্থানে ফিরে গিয়েছেন।
আর এই সুযোগটাই হয়ত খুঁজছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কারণ মমতা বুঝে গিয়েছেন, এমন সময় তাঁর দলের কেউ আর বিজেপিতে যাবে না। ফলে কোনও অন্তর্ঘাত বা ভাঙনের সম্ভাবনা নেই। আবার কেন্দ্রে বিজেপি একা সরকার গঠন করতে পারে নি। ফলে বাংলার উপর বিজেপি একা ছড়ি ঘোরাতে পারবেনা। তাই এটাই যে মোক্ষম সময় দলের নেতা, মন্ত্রী, আমলা ও পুলিশকে বেশ কড়কে দেওয়ার, সেটা মমতা ভালো মতোই বুঝেছেন।
মমতা সাফ জানিয়েছেন, যারা টাকা তুলেছেন, তারা দলের জন্য নয়, নিজেদের পকেট ভরাতে তুলেছেন। অর্থাৎ তোলাবাজির দায় যে তৃণমূল নেবে না, তা মমতা পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন। ফলে এই সময়টাই তিনি বেছে নিয়েছেন দলের নেতাদের একাংশকে ধমকানি দেওয়ার জন্য। পুলিশকেও এই কারণেই তিনি ধমক দিয়েছেন বলাই যায়!
আবার অনেকের মনে প্রশ্ন আসতেই পারে, একুশের বিধানসভা ভোটের পর তাহলে মমতা কেন কোনও পদক্ষেপ করলেন না। তৃণমূল তো ২১৭টি আসন জিতেছিল। আসলে সেই সময় এক তো কেন্দ্রে বিজেপি সরকার মজবুত ছিল। আর ভোটের ফল প্রকাশের পর থেকেই সক্রিয় হয়ে উঠেছিল ইডি-সিবিআই। বিচারব্যবস্থাও ছিল সক্রিয়। তৃণমূলের নানান নেতা পার্থ চট্টোপাধ্যায় থেকে শুরু করে অনুব্রত মণ্ডলরা পরপর গ্রেফতার হচ্ছিলেন। এর জেরে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল অস্থির। সেই কারণে সেই সময় এই কড়া পদক্ষেপ হলেও অন্তর্ঘাতের সম্ভাবনা ছিল।
কিন্তু এখন আর তা নেই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বুঝে গেছেন, এখন পরিস্থিতি অনুকূল। এই সময় যদি দলের লোকদের হুঁশিয়ারি, শাসানি দেওয়া যায়, তাহলেও দলবদলের সম্ভাবনা নেই। আর এমনটা করলে ২০২৬ সালের বিধানসভা ভোটে তৃণমূলের একটা স্বচ্ছ ভাবমূর্তিও তৈরি হতে পারে। তবে সত্যিই কী মমতার ধমকানিতে কাজ হয়ে তৃণমূল ও বাংলা শুদ্ধ হবে নাকি আবার কয়েকদিন পর সেই একই অবস্থা শুরু হয়ে যাবে, এখন সেটাই দেখার!





