রাস্তাঘাটে ছোটখাটো বচসা, চায়ের দোকানে রাজনৈতিক আলোচনা থেকে তর্কাতর্কি, এসব নতুন কিছু নয়। কিন্তু যখন সেই উত্তেজনা মারামারিতে পরিণত হয়, তখন তা শুধু ব্যক্তিগত ঝগড়া থাকে না, এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে চরম অশান্তি। সম্প্রতি রাজারহাটের শিখরপুরে ঘটে যাওয়া এক সংঘর্ষ যেন সেই ছবিকেই ফের একবার তুলে ধরল। রাতের অন্ধকারে ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছয় যে পুলিশকে লাঠিচার্জ পর্যন্ত করতে হয়।
রাজনৈতিক মঞ্চে একসঙ্গে চললেও মাঠের লড়াইয়ে একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পিছপা হন না অনেকে। বিশেষ করে পঞ্চায়েত স্তরে এই দ্বন্দ্ব বেশি দেখা যায়। ব্যক্তিগত স্বার্থ, ক্ষমতার লড়াই কিংবা অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক টানাপোড়েন—সব মিলিয়ে স্থানীয় নেতৃত্বের মধ্যে মতবিরোধ হঠাৎ করেই বড় আকার ধারণ করে। রাজারহাটের সাম্প্রতিক ঘটনাও তার ব্যতিক্রম নয়। তৃণমূলেরই দুই গোষ্ঠীর মধ্যে এমন এক সংঘর্ষ হয়েছে, যেখানে মারধরের শিকার হয়েছেন দলেরই এক পঞ্চায়েতের উপপ্রধান।
এই ঘটনায় প্রহৃত হয়েছেন আক্রামুল আলি মোল্লা নামে এক তৃণমূল নেতা, যিনি স্থানীয় পঞ্চায়েতের উপপ্রধান। তাঁর অভিযোগ, অঞ্চল সভাপতি জব্বার মোল্লার অনুগামীরা তাঁকে মারধর করেছেন। আক্রামুল জানান, গত এক মাস ধরে চাঁদপুর এলাকায় মাটি তোলার কাজ চলছে। তিনি এই কাজে আপত্তি জানিয়েছিলেন, কারণ এতে এলাকার রাস্তা খারাপ হচ্ছে এবং জলাভূমি ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এই প্রতিবাদই তাঁর বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মঙ্গলবার রাতে যখন তিনি শিখরপুর বাস স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তখন কয়েকজন যুবক তাঁকে ঘিরে ধরে। অভিযোগ, শাহবুদ্দিন মোল্লা নামে এক ব্যক্তি বন্দুক বের করে গুলি করার হুমকিও দেন। পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হয়ে ওঠে। উত্তেজিত জনতা একপর্যায়ে সড়ক অবরোধও করে।
আরও পড়ুনঃ গরমের চাপে কাহিল বাংলা! দোলেও কি মিলবে না স্বস্তি, নাকি আসছে ঝড়-বৃষ্টি?
এই ঘটনার জেরে বুধবার সকালে আক্রামুলের সমর্থকরা চাঁদপুরে রাস্তা অবরোধ করেন। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শাইনুর মোল্লা ও শাহবুদ্দিন মোল্লাকে গ্রেফতার করে। তবে অঞ্চল সভাপতি জব্বার মোল্লা তাঁর অনুগামীদের বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। সূত্রের দাবি, এই সংঘর্ষের মূল কারণ ছিল সোশ্যাল মিডিয়ায় করা কিছু মন্তব্য। মঙ্গলবার নিউ টাউনের বিধায়ক তাপস চট্টোপাধ্যায়ের ডাকা এক ইফতার বৈঠকে অঞ্চল সভাপতি জব্বার মোল্লা ও তাঁর অনুগামীরা উপস্থিত ছিলেন। সেই ছবি সমাজমাধ্যমে পোস্ট করা হয়। অভিযোগ, আক্রামুলের অনুগামীরা সেই পোস্টে আপত্তিকর মন্তব্য করেন, যা নিয়েই উত্তেজনা ছড়ায়। দু’পক্ষের মধ্যে বচসা শুরু হয়, যা শেষ পর্যন্ত মারামারিতে পরিণত হয়। এমনকি, পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে, দু’পক্ষ থানার মধ্যেও মারামারিতে জড়িয়ে পড়ে।
এই ঘটনার সঙ্গে দলের কোনও যোগ নেই বলে দাবি করেছেন বিধায়ক তাপস চট্টোপাধ্যায়। তিনি বলেন, ‘‘এটি নিছক ব্যক্তিগত লড়াই, দলের সঙ্গে এর কোনও সম্পর্ক নেই।’’ একই দাবি রাজারহাট-নিউ টাউনের তৃণমূল সভাপতি প্রবীর করেরও। তাঁর কথায়, ‘‘মারামারির ঘটনা রাজনৈতিক নয়, এটি ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের ফল। ’’তবে রাজনৈতিক মহলের মতে, এই সংঘর্ষে দলের অভ্যন্তরীণ বিভাজন স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। লোকসভা ভোটের আগে এ ধরনের ঘটনা তৃণমূলের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। দলীয় নেতাদের বারবার এই ধরনের ঘটনার জন্য সতর্ক করা হলেও, নিচুতলার কর্মীদের মধ্যে বিরোধ বন্ধ হচ্ছে না। এখন দেখার, এই ঘটনার পর শাসকদল কী ব্যবস্থা নেয় এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কোনও কঠোর পদক্ষেপ করা হয় কি না।





