মুর্শিদাবাদ, বহরমপুর, ডোমকল—শহরের পর শহর যেন জ্বলছে উত্তেজনায়। সংশোধিত ওয়াকফ আইনের প্রতিবাদে রাস্তায় নামা, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, ভাঙচুর, আগুন, আতঙ্ক—এই সব ছবি এখন খবরের শিরোনামে। মানুষের চোখে ঘুম নেই, মনে প্রশ্ন—এই রাজ্য কি সম্প্রীতির চেনা ছায়া হারিয়ে ফেলেছে? এমন অস্থির পরিস্থিতিতে কোথাও কি একটু আশার আলো দেখা যায় না?
এই উত্তাল সময়েও যখন একে অন্যকে সন্দেহ করছে, তখনই এক নিঃশব্দ মানবিক কাহিনি সোশ্যাল মিডিয়া ও সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে, যা মনে করিয়ে দিচ্ছে—এই মাটির গভীরে এখনও মিলেমিশে থাকার ইচ্ছে আছে। ধর্ম নয়, আত্মিক সম্পর্কই বড়। দুই ভিনধর্মী যুবকের একটি ছোট পদক্ষেপ, আজ গোটা বাংলার কাছে এক বড় বার্তা।
নদিয়ার নাকাশিপাড়ার উদয়চন্দ্রপুর গ্রামের ৭২ বছরের অরবিন্দ দে আচমকা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। হিমোগ্লোবিন নেমে যায় আশঙ্কাজনকভাবে। শারীরিক অবস্থা এমন জায়গায় পৌঁছয় যে, চিকিৎসকদের নির্দেশে অবিলম্বে রক্ত দেওয়া ছাড়া বিকল্প ছিল না। কৃষ্ণনগরের শক্তিনগর হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও ‘ও পজিটিভ’ গ্রুপের রক্ত জোগাড় করতে গিয়ে কার্যত দিশেহারা হয়ে পড়ে দে পরিবার। শনিবার (১২ এপ্রিল) সারা দিন বিভিন্ন ব্লাড ব্যাঙ্কে ঘুরেও মেলেনি রক্তের হদিস।
এই সময়ে একজন আত্মীয় ব্লাড ডোনেশন গ্রুপে যোগাযোগ করেন। সেখান থেকেই খবর যায় মহম্মদ হাসমাতুল্লা শেখ এবং জাহাঙ্গির আলমের কাছে। অচেনা একজন হিন্দু প্রবীণ রুগীর জন্য রক্ত চাই—এই মেসেজ পড়েই আর এক মুহূর্তও দেরি করেননি তাঁরা। কে রুগী, ধর্ম কী, কোথাকার—এই কোনও প্রশ্ন না তুলে রবিবার (১৩ এপ্রিল) সকালেই রওনা দেন কৃষ্ণনগরের দিকে। একজন ৫০ কিমি, আরেকজন ৩৫ কিমি পথ পেরিয়ে পৌঁছে যান হাসপাতালে।
আরও পড়ুনঃ Kolkata : এক সেকেন্ড দেরি হলে লাশে ভরে যেত শহর! সরকারি বাস আছড়ে পড়ল রাস্তায়, ভয়াবহ দৃশ্যে আঁতকে উঠল কলকাতা!
হাসপাতালে পৌঁছে এক বোতল করে রক্ত দেন দুই মুসলিম যুবক। দুই ইউনিট রক্ত প্রবাহিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শারীরিকভাবে সাড়া দিতে শুরু করেন অরবিন্দ দে। তাঁর পরিবার জানিয়েছে, রক্ত পেয়ে অচেনা এই দুই যুবকের কাছে আজীবনের ঋণী হয়ে থাকবেন তাঁরা। এই কাহিনি সামনে আসার পর যখন গোটা রাজ্য হিংসার আঁচে পুড়ছে, তখন এই ঘটনাই একমাত্র প্রমাণ করে দিল—বাংলার আসল চেহারা এখনও হারিয়ে যায়নি। ধর্ম নয়, মানবিকতাই চূড়ান্ত পরিচয়।





