তৃণমূল আমলের নতুন বিত*র্কে ইন্দ্রনীল সেন-মধুছন্দা সেন-শুভ! ইউনেস্কোর লোগো ব্যবহার করে চড়াদামে টিকিট বিক্রির অভিযোগে সরগরম রাজ্য! তবে কি পুজোর নামে গড়ে উঠেছিল কোটি টাকার ব্যবসা?

রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর একের পর এক সামনে আসছে তৃণমূল আমলের নানা বিতর্ক, দুর্নীতি এবং অনিয়মের অভিযোগ। কখনও কাটমানি, কখনও প্রভাব খাটিয়ে সুবিধা পাইয়ে দেওয়া, আবার কখনও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রকে কেন্দ্র করে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ঘিরে চর্চা শুরু হয়েছে। সম্প্রতি টালিগঞ্জে অভিযোগের ভিত্তিতে প্রাক্তন মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের ভাই স্বরূপ বিশ্বাস গ্রেফতার হওয়ার পর রাজনৈতিক মহলে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়। সেই আবহেই এবার অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এলেন প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক ও প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন এবং তাঁর স্ত্রী মধুছন্দা সেন। ইউনেস্কোর নাম ও লোগো ব্যবহার করে দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে চড়া দামে বিশেষ টিকিট বিক্রির অভিযোগ ঘিরে শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক।

সোমবার কলকাতা পুলিশের কমিশনার, রাজ্য পুলিশের ডিজি এবং বউবাজার থানার কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দেয় আন্তর্জাতিক পর্যটন সংস্থা মেঘদূত ফাউন্ডেশন। সংস্থার কর্ণধার জয়দীপ মুখোপাধ্যায় ও সগুনা মুখোপাধ্যায় অভিযোগে দাবি করেছেন, ইউনেস্কোর স্বীকৃতির নাম ভাঙিয়ে দুর্গাপুজোর আগে বিশেষ প্রিভিউ-শো বা আগাম মণ্ডপ দর্শনের নামে উচ্চমূল্যের ভিআইপি টিকিট বিক্রির পরিকল্পনা করা হয়েছিল। অভিযোগপত্রে ইন্দ্রনীল সেন ও মধুছন্দা সেন ছাড়াও ধ্রুবজ্যোতি বসু (শুভ), সায়ন্তন মৈত্র এবং রাজন চট্টোপাধ্যায়ের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এই প্রচারে ইউনেস্কোর নাম এবং লোগো ব্যবহার করা হলেও বাস্তবে এই ধরনের কোনও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের সঙ্গে ইউনেস্কোর কোনও সম্পর্ক নেই। ফলে আন্তর্জাতিক সংস্থার মর্যাদা এবং সাধারণ মানুষের আবেগকে ব্যবহার করে অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগকারীদের তরফে জানানো হয়েছে, পুলিশের কাছে জমা দেওয়া নথিপত্রের মধ্যে রয়েছে একাধিক সরকারি ই-মেল, আইনি দলিল এবং অন্যান্য প্রমাণ। সেই নথিতে উল্লেখ রয়েছে যে, ইউনেস্কো কখনও এই ধরনের টিকিট বিক্রি বা বাণিজ্যিক উদ্যোগের অনুমোদন দেয়নি। অভিযোগ অনুযায়ী, কলকাতার দুর্গাপুজো ইউনেস্কোর ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ’ স্বীকৃতি পাওয়ার পর থেকেই কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠী সেই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিকে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত উৎসবকে বিশেষ প্রবেশাধিকার এবং ভিআইপি সুবিধার নামে ভাগ করে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগে দাবি করা হয়েছে। যদিও এই অভিযোগের ভিত্তিতে এখনও কোনও মামলা রুজু হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। কলকাতা পুলিশের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, অভিযোগ জমা পড়েছে এবং গোটা বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় আইনি ধারা যুক্ত করার বিষয়েও পর্যালোচনা চলছে।

এই ঘটনায় সবচেয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন অভিযোগকারী সগুনা মুখোপাধ্যায়। তাঁর দাবি, ইউনেস্কো কোনও ব্যক্তিগত বা বাণিজ্যিক সংস্থার সঙ্গে এ ধরনের আর্থিক চুক্তিতে যেতে পারে না। ইউনেস্কোর তরফে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে যে, ২০২২, ২০২৩ কিংবা ২০২৪ কোনও বছরেই দুর্গাপুজোর নির্দিষ্ট কিছু মণ্ডপকে কেন্দ্র করে এমন আর্থিক চুক্তি বা টিকিট বিক্রির অনুমোদন দেওয়া হয়নি। সগুনা মুখোপাধ্যায়ের কথায়, দুর্গাপুজো মূলত মানবতার উৎসব এবং সর্বজনীনতার প্রতীক। সেখানে চার হাজার টাকার ‘ডোনার পাস’ চালু করে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকারকে সীমাবদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, একজন সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের দুই সপ্তাহের উপার্জনের সমান টাকা খরচ করে টিকিট কাটা সম্ভব নয়। ফলে আর্থিক সামর্থ্যের ভিত্তিতে মানুষকে আলাদা করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা দুর্গাপুজোর সর্বজনীন চরিত্রের পরিপন্থী।

আরও পড়ুনঃ ছাড়লেন দিদির হাত! ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের টানেই কি বিজেপির পথে দেব? দিল্লির বৈঠক ঘিরে জোর রাজনৈতিক জল্পনা! দলবদল নিয়ে কী সাফাই দিলেন মেগাস্টার?

এদিকে, এই অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর নতুন করে সরব হয়েছেন শিল্পী মহলের একাংশও। গত শুক্রবার নন্দন চত্বরে বিক্ষোভ দেখান কয়েকজন শিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মী। তাঁদের অভিযোগ, তৃণমূল আমলে বিভিন্ন সরকারি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং প্রকল্পে স্বচ্ছতার অভাব ছিল। প্রবীর দাস নামে এক সঙ্গীতশিল্পী দাবি করেছেন, একটি বেসরকারি সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে সরকারি অনুষ্ঠানের লজিস্টিক পরিষেবার কাজ পেত এবং সেই সংস্থার সঙ্গে ইন্দ্রনীল সেনের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। পাশাপাশি অনেক শিল্পীর অভিযোগ, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তাঁরা বছরের পর বছর কাজের সুযোগ পাননি। তবে ইন্দ্রনীল সেন এই সমস্ত অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে দাবি করেছেন, ব্যবসায়িক স্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যেই তাঁর বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ আনা হচ্ছে। যদিও বিষয়টি এখন তদন্তাধীন। বউবাজার থানায় জমা পড়া অভিযোগ ও নথিপত্র খতিয়ে দেখছে পুলিশ। প্রতারণা, জালিয়াতি এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার পরিচয় অপব্যবহারের মতো অভিযোগও তদন্তের আওতায় আসতে পারে বলে সূত্রের খবর। ফলে এই ঘটনায় তদন্ত কোন দিকে এগোয় এবং অভিযোগের সত্যতা কতটা প্রমাণিত হয়, সেদিকেই এখন নজর প্রশাসন, সাংস্কৃতিক মহল এবং সাধারণ মানুষের।

Khabor24x7 NewsDesk

আরও পড়ুন

আরও অন্যান্য খবর