অভাব-অনটন ছিল তাঁর ছোটবেলার সঙ্গী। তাঁর আগের প্রজন্মের কেউ তো স্কুলের চৌকাঠই পেরোয়নি। কিন্তু হার না মানা এক লড়াইয়ে নেমেছিলেন তিনি। আর সাফল্যও এল তাই। রাজ্য ও জাতীয়স্তরে অধ্যাপক হওয়ার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন তিনি। তবে অধ্যাপক নয়, ছেলেকে প্রাথমিকের শিক্ষক হিসেবে দেখতে চান বাবা। গ্রামের অন্যান্য ছেলেমেয়েদের মধ্যেও শিক্ষার আলো প্রসার করতে এখন তাদের ভরসা বেলপাহাড়ির লোধা শবর সম্প্রদায়ের যুবক কার্তিক শবর।
কী পরিচয় কার্তিকের?
বেলপাহাড়ির এড়গোদা গ্রাম পঞ্চায়েতের আশাকাঁথি গ্রামের বাসিন্দা কার্তিক শবর। স্থানীয় আশাকাঁথি নিম্ন বুনিয়াদি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই লেখাপড়ার যাত্রা শুরু তাঁর। ২০১৪ সালে ৭২ শতাংশ নম্বর পেয়ে জয়পুর হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাশ করেন তিনি। গড় রাইপুর উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ২০১৬ সালে শতকরা ৮৬.০৪ শতাংশ নম্বর নিয়ে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেন। স্নাতক হন কাফগাড়ি সেবা ভারতী থেকে।
এরপর বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূগোল নিয়ে স্নাতকোত্তর পাশ করেন কার্তিক। এখন সেবায়তন শিক্ষক শিক্ষন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে বিএডের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র। চলতি বছর রাজ্যস্তরের সেট পরীক্ষায় পাশ করেন তিনি। তারপর এবার নেট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে দেশের যে কোনও কলেজে অধ্যাপক হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছেন। এর আগে প্রাথমিকের টেট পরীক্ষাতেও সফল হয়েছেন কার্তিক।
কী জানাচ্ছেন কার্তিকের মা-বাবা?
ছেলের এই সাফল্যের আনন্দের জল এসেছে কার্তিকের বাবা নির্মল শবরের চোখে। তবে অধ্যাপক নয়, তিনি চান যে তাঁর ছেলে যাতে প্রাথমিকের শিক্ষক হন। গ্রামের ছেলেমেয়েদের মধ্যে শিক্ষার আলো প্রচার করতে ছেলেকেই কাণ্ডারি করতে চান নির্মলবাবু। তাঁর ছেলের হাত ধরেই যাতে গ্রামে শিক্ষার আলো জ্বলে ওঠে, তেমনটাই স্বপ্ন তাঁর।
নির্মলবাবু বলেন, “যা করেছে এর জন্য অবশ্যই গর্বিত। আমার পরিবারে এর আগে কেউ লেখাপড়া করেনি। শিক্ষা কী, আমরা জানি না। বাবা নেশা করে রাস্তায় পড়ে থাকত। সেই দেখে আমার চোখে জল আসত। তখন থেকেই ঠিক করেছিলাম আমার পরিবারে কেউ নেশা করবে না। কষ্ট করে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা করাচ্ছি। আর তাই আমি চাই, ছেলে প্রাথমিক শিক্ষক হয়ে গ্রামের ছোটদের একেবারে শুরু থেকে শিক্ষা দিক”। কার্তিকের মা পুষ্পও চান, “ছেলের হাত ধরে ঘরে ঘরে শিক্ষার আলো পৌঁছক”।
কার্তিক নিজে কী জানাচ্ছেন?
মা-বাবা তো বটেই, নিজের এই সাফল্যের জন্য শিক্ষিকা মিতালী পাণ্ডার অবদানও স্বীকার করেছেন কার্তিক। তাঁর কথায়, মিতালীদেবী যে শুধুমাত্র তাঁকে পড়াশোনা করিয়েছেন তা নয়, বইপত্র থেকে শুরু করে আর্থিক দিক থেকেও নানানভাবে মিতালীদেবী তাঁকে অনেক সহায়তা করেছেন।
কার্তিক বলেন, “বাবা, মা তো সবসময় উৎসাহ দিয়েছেন। কিন্তু ওই শিক্ষিকা না থাকলে হয়তো আমি এত দূর আসতে পারতাম না। আমি চাই বিশেষ করে আমার সমাজের ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করুক”। কার্তিকও চান মিতালীদেবীর মতো আদিম জনজাতি ভুক্ত শবর সম্প্রদায়ের পাশে থাকতে। পিছিয়ে পড়া এই জনজাতির ঘরে ঘরে যাতে শিক্ষার আলো পৌঁছতে পারে, সেদিকেই এখন মনোনিবেশ করতে চান তিনি।





