গাছগাছালিতে ঢাকা শান্ত এক বিকেলের ছবি। হাতে ধরা এক কাপ চা। প্রাকৃতিক দৃশ্যের সামনে দাঁড়িয়ে প্রশান্তির হাসি মুখে সাংসদ। এমন দৃশ্য দেখে কে-ই বা বলবে তাঁর নিজের কেন্দ্রই তখন উত্তপ্ত? নেটদুনিয়ায় এ ছবি শেয়ার করতেই তা ছড়িয়ে পড়ে দাবানলের মতো, আর প্রশ্ন উঠতে শুরু করে—এই প্রশান্তির ছবি পোস্টের সময় তিনি কি জানতেন, তাঁর জেলা তখন জ্বলছে?
প্রত্যেক মানুষেরই নিজের মতো করে সময় কাটানোর অধিকার আছে। তবুও, যখন কোনও জনপ্রতিনিধি জনতার ভোটে নির্বাচিত হন, তখন তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপে দায়বদ্ধতা থাকে। আর সেই কারণেই, তাঁর ‘ফুরফুরে’ পোস্ট ঘিরে এত শোরগোল। মুর্শিদাবাদ যখন উত্তাল, তখন চা হাতে বিকেল উপভোগের ছবি অনেকের কাছেই যেন বাস্তবতা থেকে পালিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত। প্রশ্ন ছুড়ছে সাধারণ মানুষ, ‘‘সংসদে কি শুধু নির্বাচনকেন্দ্র জেতাই লক্ষ্য? মানুষের যন্ত্রণার খবর রাখেন না?’’
গত মঙ্গলবার থেকেই মুর্শিদাবাদের একাধিক এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে অশান্তি। সংশোধিত ওয়াকফ আইনকে ঘিরে জঙ্গিপুরে শুরু হয় হিংসাত্মক প্রতিবাদ। ধীরে ধীরে তা ছড়িয়ে পড়ে সুতি, শমসেরগঞ্জ, ধুলিয়ান, ও জঙ্গিপুরের মতো এলাকায়। প্রশাসনের তরফে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয় বিস্তীর্ণ এলাকায়। শুক্রবার পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে পুলিশকে চার রাউন্ড গুলি চালাতে হয়। যদিও সরকারিভাবে কারও মৃত্যুর কথা স্বীকার করা হয়নি, বেসরকারি সূত্রে অন্তত তিনজনের মৃত্যুর কথা উঠে এসেছে।
View this post on Instagram
যে দিন পুলিশ গুলি চালায়, ঠিক সেই দিনই ইনস্টাগ্রামে তিনটি ছবি পোস্ট করেন বহরমপুরের সাংসদ ইউসুফ পঠান। তিনি লেখেন, ‘‘ফুরফুরে বিকেল, সুন্দর চা আর শান্ত পরিবেশ। মুহূর্তের সঙ্গে মিশে যাচ্ছি।’’ সঙ্গে ছিল এক ইংরেজি গান। পোস্টটি ঘিরেই উত্তাল হয়ে ওঠে সামাজিক মাধ্যম। একের পর এক মন্তব্যে আক্রমণ ধেয়ে আসে—“খবর রাখেন?” “কীভাবে এত নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন আপনি?” বিরোধীরা এই পোস্টকে ঘিরে কড়া সমালোচনায় মুখর হন। এমনকি, শাসকদলের অন্দর থেকেও কটাক্ষ ধেয়ে এসেছে।
আরও পড়ুনঃ AFSPA : হিন্দুদের রক্ষা করতে বাংলা জুড়ে আফস্পা চান বিজেপি সাংসদ! কাশ্মীরি পণ্ডিতদের প্রসঙ্গ টেনে তীব্র আক্রমণ তৃণমূলকে!
বিরোধীদের অভিযোগ, তৃণমূল শুধুমাত্র ধর্মীয় পরিচয়কে কাজে লাগিয়ে একজন প্রাক্তন ক্রিকেটারকে প্রার্থী করেছিল, যাঁর মাটির সঙ্গে যোগাযোগ নেই। তৃণমূলের ভরতপুরের বিধায়ক হুমায়ুন কবীরও এই বিষয়ে বলেন, ‘‘আমি প্রথমে ওঁর হয়ে প্রচারে রাজি ছিলাম না। মুখ্যমন্ত্রীর অনুরোধে রাজি হয়েছিলাম। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে সেটা আমাদের দুর্ভাগ্য।’’ এমনকি অধীর চৌধুরীও ইউসুফের পোস্ট নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, ‘‘স্থানীয় তৃণমূল নেতাদের হাতেই এই অশান্তির সূত্রপাত।’’ অর্থাৎ, যখন একাংশ মানুষ প্রাণ হাতে করে ঘরে ঢুকছেন, তখন অন্যপ্রান্তে একজন জনপ্রতিনিধির মনোরম বিকেলের ছবি যেন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংবেদনশীলতার প্রশ্নে বড়সড় এক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকল।





