সময়ের সঙ্গে বদলেছে সমাজ। নারী-পুরুষের সমানাধিকারের দাবি এখন আর শুধু স্লোগানে সীমাবদ্ধ নেই, বাস্তবেও তার কিছুটা প্রতিফলন ঘটেছে। শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানে নারীদের অংশগ্রহণ, আইন ও নীতিগত পরিবর্তন— সব মিলিয়ে নারীর ক্ষমতায়ন যেন ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে। কিন্তু এই অগ্রগতির মাঝেও বাস্তব পরিস্থিতি কি সত্যিই আশাব্যঞ্জক? পরিসংখ্যান বলছে, আজও বিশ্বের নানা প্রান্তে নারীরা নিপীড়নের শিকার। ঘর থেকে কর্মক্ষেত্র, সমাজ থেকে অনলাইন— প্রতিটি স্তরেই নারীদের নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে।
বিশ্বব্যাপী নারী অধিকার রক্ষার লক্ষ্যে একাধিক আইন কার্যকর হয়েছে। বিভিন্ন দেশ নারী সুরক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, বহু ক্ষেত্রেই তা কার্যকর হচ্ছে না। শুধু উন্নয়নশীল দেশ নয়, উন্নত দেশগুলিতেও নারীরা শারীরিক, মানসিক ও যৌন হিংসার শিকার হচ্ছেন। একদিকে নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে তাঁদের মৌলিক নিরাপত্তার অভাব প্রকট হয়ে উঠছে। এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রসঙ্ঘের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদন নতুন করে চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাষ্ট্রসঙ্ঘের নারীবিষয়ক সংস্থা ইউএন উইমেন প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ভয়াবহ তথ্য। তাতে বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে নারীদের অধিকার ২০২৪ সালে আরও দুর্বল হয়েছে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির অবক্ষয়, জলবায়ু পরিবর্তন, বৈষম্যমূলক নীতি— সব মিলিয়ে নারী নিরাপত্তার অবস্থা ক্রমশ খারাপ হচ্ছে। শুধু তাই নয়, ১৯৯৫ সালের বিশ্ব নারী সম্মেলনের ঘোষিত নীতিগুলি বাস্তবায়িত করতে গিয়েও বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে বহু দেশকে। পার্লামেন্টে নারীদের প্রতিনিধিত্ব বাড়লেও এখনো ৭৫ শতাংশ সংসদ সদস্য পুরুষ।
আরও পড়ুনঃ সন্ত্রাস দমনে প্রশংসা, তবু আমেরিকায় নিষেধাজ্ঞার কোপ! পাকিস্তানিদের জন্য ফের কঠোর হল প্রবেশ নীতি!
তবে সবচেয়ে ভয়াবহ যে তথ্য উঠে এসেছে, তা হল— বিশ্বের প্রতি তিনজন নারীর মধ্যে একজন তাঁর ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর দ্বারা শারীরিক বা যৌন হিংসার শিকার হয়েছেন। এমনকি বহু ক্ষেত্রে এই নির্যাতন সঙ্গীর বাইরেও বিস্তৃত। এছাড়া গত ১০ বছরে সংঘাত-সম্পর্কিত যৌন হিংসার হার ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যার শিকার ৯৫ শতাংশই শিশু বা কিশোরী। শুধু শারীরিক নিপীড়ন নয়, অনলাইন দুনিয়াতেও নারীরা ক্রমাগত লিঙ্গভিত্তিক হিংসার শিকার হচ্ছেন। ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ার ১২টি দেশে কমপক্ষে ৫৩ শতাংশ নারী অনলাইনে যৌন হয়রানির অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোভিড-১৯ মহামারি, বিশ্বজুড়ে সংঘাত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) প্রসার— এসবকিছু মিলিয়ে নারী অধিকার আরও সংকটে পড়তে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। তাই প্রযুক্তির ন্যায্য ব্যবহার নিশ্চিত করা, দারিদ্র্য বিমোচনে বিনিয়োগ এবং নারীদের বিরুদ্ধে হিংসার বিরুদ্ধে কঠোর লড়াই চালানোর সুপারিশ করা হয়েছে। এখন দেখার, আন্তর্জাতিক মহল কীভাবে এই সংকটের মোকাবিলা করে।





